৩ নম্বর ফ্লোরের পেছনে এফডিসির সুইমিং পুলটা এখন আর নেই । সুইমিং পুল তো দূরের কথা, তিন নম্বর ফ্লোরটায় তো নাই। এই সুইমিং পুলে নেমেই একসময় সুইমসুট পরে পানিতে নেচে দর্শকের মন ভোলাতেন ময়ূরী, মুনমুন, পলিরা। অশ্লীলতার রমরমা জোয়ারের সময়ে সুইমিং পুলে শুটিং মানেই কঠিন নিরাপত্তা। খোলামেলা পোশাকে নারী অভিনয়শিল্পীদের ভিড়। সেসময় আজকের রাসেল মিয়ারা থাকলে হালাল সিনেমা বানানো তো দূরের কথা- হয়তো চোখে পর্দা করে বের হতে হইতো তাদের!
এফডিসির সেই সুইমিং পুলের জায়গায় এখন নির্মিত হচ্ছে এক বিশাল বহুতল বিল্ডিং। যেখানে শপিং মল, সিনেপ্লেক্সসহ নানা কিছু হবে। কয়েক বছর ধরেই চলছে কর্মযজ্ঞ। ফলে আপনি চাইলেও এখন আর সেই সুইমিং পুল দেখতে পারবেন না। তবে, অবশ্য আমার কাছে একটা ভিডিও আছে- সুইমিং পুলের। গুগল ড্রাইভে রেখে দিছি। চাইলে একসময় দেখাবোনি।
যাই হোক, মূল আলাপে ফিরি। আমি যেহেতু বিনোদন সাংবাদিকতা করি, ফলে সিনে দুনিয়ার অনেক গোপন খবর জানি। এমনও অনেক খবর আছে, যা চাইলেও পত্রিকার পাতায় লিখতে পারি না। আজ আপনাদেরকে যে ঘটনা বলব, এই ঘটনাটাও লিখতে পারি নাই কখনো। লিখতে না পারার বেদনা এখনো আমাকে কুরে কুরে খায়।
ঘটনাটা ২০০৫/০৬ সালের। বাংলা সিনেমায় তখন অশ্লীলতার জোয়ার। কিছু ভালো সিনেমাও নির্মিত হতো। তবে তা হাতে গোনা।
এফডিসি তখন রমরমা। সেদিন এফডিসির প্রতিটি ফ্লোরেই চলছিল শুটিং। ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়ানোই দায়। চারদিকে গমগম করছিল।
কড়ই তলায় বস্তি বানিয়ে শুটিং হচ্ছিল মান্না ডিপজলের সিনেমার। ঝর্নাস্পটের সামনে শাবনূর রিয়াজের গানের দৃশ্য। আর ৮ নাম্বার ফ্লোরে গিয়ে দেখলাম, মাসুম বাবুল নায়িকা মৌসুমীরে নাচের মুদ্রা বোঝায়া দিতেছে।
পরিচালক সমিতির সামনে বসে ততক্ষণে খোশগল্পে মেতে উঠেছেন শহীদুল ইসলাম খোকন আর অভিনেতা রুবেল। ২ নম্বর ফ্লোরে আমিন খানের শুটিং। আর প্রযোজক সমিতির সামনে দেখলাম, বদিউল আলম খোকন লিকলিকে শাকিব খানকে বিশাল পাঞ্জা মারার ফাইট দৃশ্য বোঝায়া দিচ্ছে।
পুরো এফডিসি চক্কর দিয়ে ৩ নাম্বার ফ্লোরের সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম, ভেতরে স্বল্পবসনা মেয়েদের কোলাহল। সহকারী পরিচালক কালাম আমারে দেখেই এক গাল হেসে বলল, আরে ভাই যে! গত সপ্তাহে আপনার লেখাটা পড়লাম, ভাই-ও (ডিরেক্টর) আপনার লেখাটা পড়ছে। ভালোই হইছে কিন্তু কিছু কিছু বিষয় না লিখলেও পারতেন।
জবাবে বললাম, আপনাদের এই এক সমস্যা- শুধু প্রশংসা চান। মাঝে মাঝে সমালোচনাও সহ্য করতে হবে।
কালাম বললো, আমার কাছে ঠিকই আছে। আপনারা তো লেখবেনই। লেখেন। সমস্যা নাই।
জিজ্ঞাসা করলাম, কোন ছবির শুটিং? প্রশ্ন শুনে কালাম জিহ্বায় কামড় দিয়ে বললো, আজকেরটার নিউজ করা যাবে না ভাই। নতুন পরিচালক।
কালামের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, আরে আমরা তো নতুনদেরকেই বেশি কাভারেজ দেই।
কালাম বললো, ধুর মিয়া, আপনি বোধহয় কিছুই বোঝেন না। আজকে সিগারেটের কাজ।
কালাম এবার আমাকে টানতে টানতে তিন নাম্বার ফ্লোরের মেকআপ রুমের সামনে নিয়ে গেল।
যেতে যেতে আমি বললাম, বুঝছি- সি গ্রেডের কাজ করতেছেন। কিন্তু আপনে তো এই সব সিনেমায় অ্যাসিস্ট করেন না?
চোখে মুখে লজ্জা বাড়িয়ে দিয়ে জিহ্বায় ডাবল কামড় দিয়ে কালাম বললো, ভাইরে পেটের দায়ে করা লাগে। মাঝে মাঝে যখন কাম থাকে না তখন টুকটাক করি। আর আপনের ভায়ে তো সিনেমা বানায় বছরে একটা দুইটা। ভাইয়ের ভরসায় বইসা থাকলে তো চলে না। অবশ্য, ভাইয়ে মানসম্মত সিনেমা বানায়। কওয়ার মতো কাজ ভাইয়েরটায় হয়। বাকিগুলার নাম কইতে পারি না কারো সামনে।
আমাদের আলাপের বেঘাত ঘটিয়ে মেকআপ রুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক মেয়ে। সুইম সুট পরা। উপরে উড়না দিয়ে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু উড়নাটা এতো পাতলা যে, মেয়েটা যে সুইম সুট পরেছে তা পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। মেয়েটি এসেই কালামকে বলল, ভাই আমি রেডি। চলেন…
জবাবে কালাম বললো, চলো।
আমারেও ঈশারা দিল কালাম। কানে কানে বলল, আসেন সমস্যা নাই। শুধু নিউজ কইরেন না।
আমিও চোখের ইশারায় বলে দিলাম, নিউজ করবো না।
কালাম আমাদেরকে নিয়ে গেল সুইমিং পুলে।
যেতে যেতেই পরিচিত হলাম বিকিনি পরা মেয়েটির সঙ্গে। ওর নাম সামিয়া। এই ছবির দ্বিতীয় নায়িকা। মূল নায়ক-নায়িকা ময়ূরী ও মেহেদী। সামিয়ার যুগল হচ্ছে সোহেল। এখন সুইমিং পুলে সামিয়া আর সোহেলের রোমান্টিক গানের দৃশ্য ধারণ করা হবে।
আমি সাংবাদিক জেনে সামিয়া চাঁপা হেসে বলল, শুধু বড় বড় নায়িকাদের ইন্টারভিউ নেন আপনারা, আমাদের কেউ ইন্টারভিউ নেয় না। জানেন, মাঝে মাঝেই আফসোস হয়, কবে আপনাদের ম্যাগাজিনের কাভারে আমার ছবি ছাপা হবে?
জবাবে আমি বললাম, এই মুহূর্তে তোমাকে নিয়ে কাভার ফিচার করা সম্ভব নয়, তবে ভেতরের পাতায় তোমার ফিচার করতে পারব।
কবে করবেন? জবাবে বললাম আগামীকাল।
সামিয়া হেসে বলল, আচ্ছা।
বলেই গড়গড় করে হেঁটে সুইমিং পুলের কোনায় গিয়ে দাঁড়ালো।
ডিরেক্টর অ্যাকশন বলতেই পানিতে নেমে অশ্লীল দৃশ্যে মেতে উঠল সোহেল আর সামিয়া।
বেশিক্ষণ দাঁড়ালাম না। কালামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলাম।
পরদিন ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে। ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম, সামিয়ার মিসকল।
ফোন ব্যাক করলাম, সামিয়া বললো – ভাই , আমার ইন্টারভিউ নিতে চেয়েছিলেন, কখন আসবেন?
জবাবে বললাম, তোমার শুটিং কয়টা পর্যন্ত চলবে
বলল, গভীর রাত পর্যন্ত।
আমি বললাম, ঠিক আছে সন্ধ্যার দিকে আসব এফডিসিতে।
জবাবে সে বলল, সন্ধ্যার দিকে না। এগারোটার দিকে আসেন। ফুল নাইট শুট হবে। আর গতকাল একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। নিউজটা পাবলিশড হওয়ার পর চারদিকে তোলপাড় শুরু হয়ে যাবে।
আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি অবশ্যই আসব।
মারাত্মক একটা নিউজ পাওয়ার উত্তেজনায় আমি টগবগ করতে থাকলাম।
কথামতো রাত এগারোটার দিকে এফডিসিতে গিয়ে হাজির হলাম। গেটের দারোয়ান আমাকে দেখে চা খাওয়ার আবদার করলো। ২০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, সবাই মিলে চা খায়েন।
ভেতরে ঢুকে তিন নাম্বার ফ্লোরে গিয়ে দেখলাম, ফ্লোর বন্ধ। সামিয়াকে ফোন দিলাম, ফোন ধরে বলল, সুইমিং পুলে আসেন।
তিন নাম্বার ফ্লোরের পেছনের জায়গাটা অনেকটা নিরিবিলি। সুইমিং পুলের পাশেই স্টোর রুমগুলোও যেন নিস্তব্ধ। কিছুটা খটকা লাগলো, এখানে তো কোনো শুটিংয়ের সেট নেই। এখানে কেন আসতে বললো মেয়েটা!
তারপরও সুইমিং পুলে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম, সুইমিং পুলের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সামিয়া।
ওকে দেখেই জানতে চাইলাম, কই, শুটিং কই?
সামিয়া হেসে বলল, আজকে শুটিং ৭ নাম্বার ফ্লোরে।
জবাবে বললাম, তাহলে এখানে আসতে বললে কেন?
সামিয়া বললো, গতকাল ঘটনাটা এখানেই ঘটেছে তো, তাই অন স্পটেই আপনাকে ডেকেছি।
আমি বললাম, ঠিক আছে। এবার বলো কি ঘটেছে গতকাল?
সামিয়া বললো, আমার প্রযোজক আমারে মূল নায়িকা বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে এই প্রজেক্টে আমাকে যুক্ত করে। কিন্তু গত কয়েকদিন শুটিং করার পর বুঝতে পারলাম আমি আসলে এখানে সেকেন্ড নায়িকা। আমারে পুরাই ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা বানায়া দিছে। গতরাতে তিনটা পর্যন্ত শুটিং করি। শুটিং শেষে প্রযোজকের কাছে কৈফিয়ত চাইলে তারা আমাকে প্রচুর মারধর করে। তারপর সুইমিং পুলের পানিতে চুবিয়ে মারে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, বলো কি? শিল্পী সমিতিতে বিচার দাও নাই?
ঠিক এমন সময়ে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। সামিয়া সতর্ক হয়ে ওঠে। পেছনে তাকিয়ে দেখি, কালাম আসছে।
সামিয়া বললো, কালাম আসছে। কালামের সামনে আর কিছু বলতে পারব না। আপনিও তারে বইলেন না প্লিজ, যে এসব বলেছি আপনারে।
‘ঠিক আছে- বলব না’ বলে কালামের দিকে ফিরে তাকালাম।
কালাম আমাকে দেখেই বললো, আরে দীপ ভাই, আপনি একা একা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
আমি জবাবে বললাম, একা কই, সামিয়ার সঙ্গে কথা বলছিলাম।
সামিয়ার নাম শুনেই অবাক হয়ে কালাম বলে, কি বলছেন এসব। সামিয়া কোত্থেকে আসবে!
আমি বললাম, ‘এই তো সামিয়া।’ বলেই ঘুরে সামিয়ার দিকে তাকালাম। দেখি সামিয়া হাওয়া। কোথাও কেউ নেই।
ভাবলাম, মেয়েটি লুকোচুরি খেলছে নাকি কালামের ভয়ে লুকিয়ে পড়লো কোথাও?
আমি উচ্চ স্বরে বললাম, এই সামিয়া, কই গেলা!
কালাম এবার আমাকে অনেকটা জোর করেই সেখান থেকে টেনে নিয়ে স্টোর রুমের করিডোরে এনে দাঁড় করিয়ে যা বললো- তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
কালাম বললো, সামিয়া তো গতরাতে মারা গেছে।
আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল।
বললো, গতরাত তিনটায় সুইমিং পুলে শট দেওয়ার সময় হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে সামিয়া।
কথাটা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
কালাম আমাকে এফডিসি থেকে বের করে এনে একটা রিকশায় তুলে দিল।
সামিয়ার মৃত্যু রহস্য নিয়ে এরপর অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেছি কিন্তু কোনো ক্লু খুঁজে পাই নি। একে তো নতুন, তারওপর আবার সি গ্রেডের নায়িকা, ফলে তার মৃত্যুর নিউজটাও খুব সহজেই মাটি চাপা দেওয়া গেছে।
তবে এতটুকু শিউর হয়েছি সামিয়ার মৃত্যু স্বাভাবিক হার্ট অ্যাটাক ছিল না। তার সঙ্গে খুব খারাপ কিছু হয়েছিল।
তারপর কেটে গেছে কয়েক মাস। একদিন খবর এলো এফডিসির সুইমিং পুলে একজন নাইট গার্ডের লাশ পাওয়া গেছে।
পরদিন এফডিসির এক গার্ডের সঙ্গে আলাপ হলো। সে বললো, সেদিন রাতে নাকি সুইমিং পুলের দিকে এক নারীর কান্না শুনে ডিউটিরত সেই গার্ড দেখতে গিয়েছিল। তারপর সেখানে অদ্ভুত কিছু ঘটেছিল। আর সেই গার্ড নিজের জীবনের বিনিময়ে দেখেছিল অশরীরী বিকিনি গার্লদের নৃত্য।
গার্ড আরও বলল, ইদানিং প্রতি রাতে তিনটার দিকে এফডিসির সুইমিং পুল থেকে ভেসে আসে এক নারীর আর্তচিৎকার। গভীর রাতে ভয়ে কোনো গার্ড আর সেদিকে যায় না।
গল্প: বিকিনি পরা মেয়েটি নায়িকা হতে চেয়েছিল
#সুদীপ্ত_সাইদ_খান
১৮ নভেম্বর ২০২৫
সূত্র: সুদ্বীপ্ত সাঈদ খান এর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত।