বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন

“এসো নিজকে নিজে চিনি” পরিবার আয়োজিত বাউল গানের প্রতিযোগিতার ফাইনাল সম্পন্ন

সুহৃদ রোমিও
  • প্রকাশ সময়ঃ শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২১
  • ৪৪ বার পড়া হয়েছে

বাউল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়। বাংলার মাটিতে এর উদ্ভব ও বিকাশ। বাউল গান বাউলদের ধর্মসাধনার অঙ্গ। মূলত সাংগীতিক চেতনা, ধর্মীয় আবেগ, দর্শন ও আত্মোন্নতির বাসনা বাউল গান রচনার মূল চালিকাশক্তি হলেও ভাষাভঙ্গির ও প্রকাশরীতির কারণে তাতে সাহিত্যের গুণও সঞ্চারিত হয়েছে।

‘দৃশ’ ধাতু থেকে দর্শন শব্দের উৎপত্তি। ’দৃশ’ ধাতুর অর্থ দেখা। আমরা চর্ম চক্ষু দ্বারা তা দর্শন বটে, তবে তা শাস্ত্রীয় দর্শন নয়। দর্শন শাস্ত্রে দ্রষ্টার মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলব্ধির প্রতিফলন থাকে। একজন ব্যক্তি জগৎ-জীবন-সংসারকে কিভাবে দেখে অথবা দেখার পর তার মনে কিরূপ ভাবের সঞ্চার হয় তাতেই প্রকৃত দর্শনের উৎস নিহিত আছে। বাউলরা উপাসক সম্প্রদায় হওয়ায় তাদের দর্শন ধর্মভিত্তিক। তারা অধ্যাত্নবাদী তাই তারা অন্তর্মুখী চেতনা লালন করে। বাউলরা জগত- সংসারকে তাদের এরূপ ধর্মীয় চেতনার আলোকেই দেখে।তাদের আরাধ্য পরমাত্মা কোন শাস্ত্রীয় দেবতা নন। তিনি বিশ্বলোলোকেই ব্রক্ষসত্তারূপে আর মানবদেহে আত্মারূপে বিরাজ করেন।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন, ‘কীর্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি,/ মনের গোপনে নিভৃত ভুবনে দ্বার ছিল যতগুলি।’ (‘আমরা’) হ্যাঁ, বাউল গান নিভৃত মনের ও গোপন সাধনার গান। মনের মানুষকে খুঁজে নেওয়ার গান। সেই মধ্যযুগে যার সূচনা, এই একুশ শতকে এসেও তার ধারা থেমে যায়নি। বাউল গানের তত্ত্ব আর রসভাষ্য রচনায় গবেষকরা ক্লান্তিহীন, সেই গবেষণার ভুবনে কবি ও প্রাবন্ধিক শান্তি সিংহ তাঁর ভূমিকা ও সামর্থ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যের নিরলসচর্চায় তাঁর অবদান যথেষ্ট। তথাকথিত বাবু-গবেষক না-হয়ে মেঠো-গবেষক হতে তিনি লজ্জিত হন না। মাঠ-ঘাট-কুটির-আখড়া সর্বত্র তাঁর যাতায়াত। ছাই ঘেঁটে সোনা তুলে আনাই তাঁর সাধনা।

বাংলায় বাউল গান-চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘকালের। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ ও চেষ্টা কারোর অজানা নয়। ইংরেজিতেও অনুবাদ করে বাউল গানকে তিনি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। শান্তি সিংহ এক মহত্তর ভাবনায় কাজ করেছেন। আমরা যে-গান জানি, পড়ি, তার ভেতরেও অন্য তাৎপর্য আছে তা বাউলেরা বলেন, সে-তত্ত্ব লেখক নির্দেশ করেছেন। বাউল তত্ত্ব এবং লালন ফকির নিয়ে তাঁর আলোচনা সুস্পষ্ট পরিচ্ছন্ন। শুধু পান্ডিত্য নয়, রসগ্রাহিতাও আছে। যার সম্যক প্রকাশ দেখি তাঁর বাউল গানে বৈষ্ণবীয় ভাব-ভাবনর ব্যাখ্যায়। লালনের বাউল গান মানেই অচিন পাখির তত্ত্ব, আলেক তত্ত্ব, জাত-ধর্মের দ্বন্দ্ব দূর করার গান। শান্তি সিংহ অজস্র গান সংকলিত ও বিন্যস্ত করে দেখালেন, বৈষ্ণব পদাবলীর ‘চৈতন্যলীলা’, ‘কৃষ্ণলীলা’ও লালন কীভাবে বাউল গানে ব্যক্ত করেছেন। গানগুলো নিশ্চয় ‘পদাবলী’ নয়, অথচ বাউল-পদাবলি বটে।

বাউল গানে ইহমূখী মানবতার কথা যেমন আছে তেমনি ইহবিমুখ বৈরাগ্যের কথাও আছে। অর্থাৎ তারা যেমন মানবতাবাদী (humanist), তেমনি বৈরাগ্যবাদী (nihilist)। আপাতদৃষ্টিতে তা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। বাউলগণ যে ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করত, তা ছিল সামন্ততান্ত্রিক। এ ব্যবস্থার ভেদাভেদের ও শোষণ-বঞ্চনার অজস্র বেড়াজালের মধ্যে এই বৈরাগ্যের ও নৈরাশ্যের বীজ নিহিত ছিল। নিষ্ঠুর সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-শাসন, ধর্মশাসনের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ আছে, কিন্তু নতুন করে গড়ার স্বপ্ন নেই। তারা পালিয়ে গিয়ে বিবাগী হয়ে জীবন কাটাতে চায়; সমাজ-সংসারে বিরাজমান হতাশা ও নৈরাশ্য তাদের এরূপ ভাবাবেগের জন্ম হয়। বাউলরা মানবজন্মকে গুরুত্ব দেয় কিন্তু সংসার বন্ধনকে মানতে চায় না।

বাউলদের নৈরাশ্যবাদ এক অর্থে মানবতাবাদের পরিপোষক। জাগতিক মোহ ভগবৎ প্রেমের পথে বাধাস্বরূপ। সংসার বন্ধন ছিন্ন করে ভগবৎ সত্তার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ বাউল সাধনার মূল লক্ষ্য। তাকে সর্বস্বভাবে না পাওয়ার জন্যেই বাউলের কল্পনা। গগন হরকরা বলেন: “আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে। হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে।”

সবশেষে এটাই বলা যায় যে এখানে ঘর নেই, পথ আছে। বাউলরা অন্তহীন পথের পথিক। সাংসারিক মানুষ ভোগের সামগ্রী না পেলে নৈরাশ্যবাদী হয়। বাউলের নৈরাশ্যবাদ ভগবৎ-সত্তাকে না জানা, না পাওয়ার জন্যে। জাগতিক মানুষের কাছে তাই তারা বিবাগী, কিন্তু নিজেদের কাছে তারা মুক্তি সন্ধানের পথিক। রবীন্দ্রনাথ তার স্বকীয় নানা সৃষ্টিতে বাউল বৈরাগীকে এরূপ মুক্তি ও আনন্দের প্রতীক রূপেই চিহ্নিত করেছেন। তারা নিজেরা মুক্ত থেকে অন্যকে মুক্তির পথ দেখায়।

“এসো নিজেকে নিজে চিনি” অনলাইন সংগঠন প্রায় পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে অনলাইনের বিভিন্ন এ্যাপসের মাধ্যমে বিশ্বের সকল বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে বাউল গান ও তার মহত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। এই অনলাইন সংগঠনটির মূল মুখপাত্র রেজাউল করিম রানা, অনলাইন এ যাকে দয়ালের পাগল রানা হিসেবেই চেনেন সকলে। রানার উৎসাহে, উদ্দিপনায় বাংলাদেশে বসবাসকারী, প্রবাসী ও পশ্চিম বঙ্গের কিছু বাউল গান প্রেমীদের একত্রিত করে তিন বছর যাবৎ বাউল গানের প্রতিভা অন্বেষণ করে আসছে।

এবছর বিগো লাইভ এ্যাপস এ শেষ হলো তার তৃতীয় আসর। গত ২০ অক্টোবর অনলাইন এ্যাপস বিগো লাইভ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বাউল গানের প্রতিযোগিতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হলো।

“এসো নিজকে নিজে চিনি” পরিবার আয়োজিত বাউল গানের ৩য় আসরের আয়োজনে আয়োজক কমিটিতে ছিলেন-প্রধান উপদেষ্টা এম কে মুরাদ, আয়োজক- ইসমাইল, আলী, পাগল শরীফ, মহসিন, আরিফুল ইসলাম, জসিম, শামীম, কবির, ফরিদুল আলম ফরিদ, হক সাহেব, হাসান রাজা, পারভেজ, আলী কোলকাতা, নাজিম, সুজন বন্ধু, মুজিব শাহ্ ও দয়ালের পাগল রানা।

এ আসরে বিচারক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন- (১) বাউল সাধক আলমাস সরকার, (২) বাউল শিল্পী লতা দেওয়ান ও (৩) বাউল শিল্পী সুজন সরকার।

উক্ত আসরের ব্রডকাষ্টার হিসেবে সর্বক্ষণ ব্রডকাষ্টিং পরিচালনা করেছেন দয়ালের পাগল রানা, উপস্থাপনায় ছিলেন রোমিও রাজবাড়ী ও হাসন রাজা। সমগ্র অনুষ্ঠানের মিডিয়া কাভারেজ (মিডিয়া পার্টনার) ও দিক নির্দেষনার সহযোগিতায় আছে “জনতার নিঃশ্বাস” (www.janatarnissash.com) ও জনতার নিঃশ্বাস সম্পাদক ফরিদুল আলম ফরিদ (বিগো আইডি- রোমিও রাজবাড়ী)।

দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে বিগো লাইভ এ্যাপ্স এ আসর চলার পর গত ২০ অক্টোবর ২০২১ প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড অর্থাৎ গ্রান্ড ফিনালে অনুষ্ঠিত হয়।

বাছাইপর্ব থেকে ১ম রাউন্ড এবং ১ম রাউন্ড থেকে ২য় রাউন্ড, এরপর ২য় রাউন্ড থেকে ৩য় রাউন্ড এবং ৩য় রাউন্ড থেকে বাদ পড়েছেন সিঙ্গার শুভ (কিশোরগঞ্জ) ও কাতার প্রবাসী মোঃ ইয়াসিন (বরিশাল)। আর ৩য় রাউন্ডে অনুপস্থিত ছিলেন সিঙ্গার রেজা (ঢাকা) ও ঝুমা কলিজা (গোপালগঞ্জ)। যে ৮ জন সুপার টেন এ লড়ছেন, তারা হলেন- ১. সিঙ্গার মুন (সিলেট), ২. আরিফ (বাগেরহাট), ৩. প্রজাপতি (বগুড়া), ৪. বাউল মন ইদ্রিস (চাঁদপুর), ৫. আলতাফ সরকার (ফরিদপুর), ৬. সুজন (গাইবান্ধা), ৭. টুকটুকি আঁখি (রাজশাহী), ৮. সুরের পথিক (নাটোর)।

এই আট প্রতিযোগীর মধ্য থেকে বিচারকদের রায়ে ও প্রাপ্ত নাম্বার পেয়ে ফাইনাল রাউন্ডে ৪জন যায়গা করে নেয়। নিয়মানুযায়ী ৫ জনকে ফাইনাল রাউন্ডে উন্নিত করার কথা থাকলেও ৩য় রাউন্ডে ৫ম স্থান অর্জন করেন অর্থাৎ একই নাম্বার ২জন প্রতিযোগী পান। গতকাল সেই দুই জন (সুজন ও সিঙ্গার মুন) এর মাঝে আবার অডিশন নেয়া হয়। এখানে সুজন (গাইবান্ধা) সবার চেয়ে বেশি নাম্বার পেয়ে ফাইনাল পর্বে উন্নিত হন। বাদ পরে জান সুনামগঞ্জের মেয়ে সিঙ্গার মুন।

ফাইনালে যে ৫জন মোকাবেলা করেন তারা হলেন-

০১. সুজন, প্রাপ্ত নাম্বার, ০২. সুরের পথিক, ০৩. টুকটুকি আঁখি, ০৪. প্রজাপতি, ০৫. বাউল মন ইদ্রীসল। ফাইনালে প্রত্যেক প্রতিজোগিকে তিনটি করে গান গাওয়ার পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম করে দেওয়া হয় এবং প্রতিজোগিরা সে মোতাবেক খালি গলায়, মিউজিক ছাড়া একটি ও মিউজিকসহ দুটি করে গান করেন।

সুদক্ষ বিচারকদের রায়ে এই আসরে প্রথম স্থান অধিকার করেন নাটোরের ছেলে সুরের পথিক (বিপুল সরকার),  দ্বিতীয় হন বগুড়ার মেয়ে প্রজাপতি ও তৃতীয় হন উত্তর বঙ্গের আর এক মেয়ে রাজশাহীর টুকটুকি আঁখি। এবারের আসরে উত্তর বঙ্গের প্রতিজোগিদের জয় জয়াকার।

নিম্নে সেরা পাঁচ জন-

০১. সুরের পথিক, প্রাপ্ত নাম্বার- ২৯.৭

০২. প্রজাপতি, প্রাপ্ত নাম্বার- ২৯.১

০৩. টুকটুকি আঁখি, প্রাপ্ত নাম্বার- ২৮.২

০৪. বাউল মন ইদ্রিস, প্রাপ্ত নাম্বার- ২৫.৫

০৫. মামা ভাগ্নে (সুজন), প্রাপ্ত নাম্বার- ২৩.০

দয়া করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
© All rights reserved © 2021 Janatarnissash
Theme Dwonload From