ফরিদুল আলম ফরিদ: বৈশাখের ঐতিহ্য বাঙালি সংস্কৃতির এক অমূল্য অংশ। পহেলা বৈশাখ (বা পয়লা বৈশাখ) বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, যা বঙ্গাব্দের শুরু। এটি কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন লোকউৎসব- যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালি একসঙ্গে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।
ঐতিহাসিক পটভূমি
বৈশাখের উৎপত্তি মূলত মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে (১৬শ শতাব্দী)। তখন কৃষকদের জমির খাজনা আদায়ে সমস্যা হতো, কারণ হিজরি চান্দ্র সন আর ফসল কাটার সময় মিলত না।
আকবর ফসলি সনের ভিত্তিতে বাংলা সন (বঙ্গাব্দ) চালু করেন, যা সৌরভিত্তিক। ১৫৮৪ সাল থেকে এই ক্যালেন্ডার প্রচলিত হয়। পহেলা বৈশাখকে খাজনা আদায়ের শুরু হিসেবে ধরা হতো
এটি ছিল হালখাতার দিন।
প্রাচীনকালে এর সঙ্গে কৃষি ও ফসল কাটার উৎসবও জড়িত ছিল। বাংলাদেশে এটি ১৪ এপ্রিল এবং পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত ১৫ এপ্রিল (কখনো ১৪ এপ্রিল, লিপ ইয়ারে) পালিত হয়। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বৈশাখের প্রধান ঐতিহ্য ও আয়োজন
বৈশাখের উদযাপন গ্রাম ও শহরে সামান্য ভিন্ন হলেও মূল সুর একই- পুরোনোকে বিদায় ও নতুনকে স্বাগত।
হালখাতা (নতুন হিসাবের খাতা)
ব্যবসায়ীদের জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতা খোলা হয়। গ্রামে-শহরে দোকানদাররা পুরোনো খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করিয়ে নতুন বছর শুরু করেন। এটি সমৃদ্ধি ও সৎ ব্যবসার প্রতীক।
পোশাক ও সাজসজ্জা
নতুন জামা-কাপড় পরা হয়। নারীরা সাদা-লাল পাড়ের শাড়ি, আলপনা-কাজ করা ব্লাউজ, ফুলের গয়না পরেন। পুরুষরা পাঞ্জাবি-পাজামা বা ধুতি-পাঞ্জাবি। শহরে এখন ফিউশন ও আধুনিক ডিজাইনও জনপ্রিয়।
পান্তা-ইলিশ ও ঐতিহ্যবাহী খাবার
সকালে পান্তা ভাত (আগের দিনের ভাত পানিতে ভিজিয়ে রাখা) খাওয়া হয় নানা ভর্তা (আলু, বেগুন, শুঁটকি, ইত্যাদি) দিয়ে। বাংলাদেশে এর সঙ্গে ইলিশ মাছ যুক্ত হয়েছে (১৯৮০-এর দশক থেকে জনপ্রিয়)। গ্রামে এটি সরল, শহরে রেস্তোরাঁয় জাঁকজমকপূর্ণ। এছাড়া মিষ্টি, জিলাপি, সন্দেশও খাওয়া হয়।
মঙ্গল শোভাযাত্রা
ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয় বিশাল শোভাযাত্রা। বিভিন্ন মুখোশ, রাক্ষস-খোক্কস, পশু-পাখির প্রতিকৃতি, ঢোল-কাঁসার তালে নাচ-গান হয়। এটি অতীতের গ্লানি মুছে নতুন বছরে মঙ্গল ও সমৃদ্ধি আনার প্রতীক। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের “এসো হে বৈশাখ” গান দিয়ে শুরু হয়।
বৈশাখী মেলা
গ্রামে-শহরে মেলা বসে। হস্তশিল্প, খেলনা, মাটির জিনিস, খাবারের স্টল থাকে। নাগরদোলা, গান-বাজনা, লোকসংগীত, বাউল গান হয়। এটি বাঙালির গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
আলপনা ও সাজসজ্জা
উঠোন, রাস্তা, দেয়ালে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকা হয়- ফুল, পাখি, মাছ, জ্যামিতিক নকশা। বাড়ি-দোকান সাজানো হয় ফুল, বাঁশ-পাতা, রং-বেরঙের কাগজ দিয়ে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকগান, নৃত্য, নাটক। পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, শুভেচ্ছা বিনিময় (“শুভ নববর্ষ”)।
গ্রাম vs শহরের বৈশাখ
গ্রামে: হালখাতা, সরল পান্তা-ভর্তা, ছোট মেলা, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে উদযাপন।
শহরে: বর্ণিল শোভাযাত্রা, রেস্তোরাঁয় পান্তা-ইলিশের আয়োজন, কনসার্ট, ফ্যাশন।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
আজকাল আধুনিকতার ছোঁয়ায় বৈশাখ আরও প্রাণবন্ত হয়েছে- সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছা, থিমেটিক ফটোশুট, ফিউশন পোশাক। তবে কেউ কেউ বলেন, ঐতিহ্যের মূল (হালখাতা, গ্রামীণ মেলা) কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে। তবু এটি বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক হয়ে আছে- একতা, আনন্দ ও নতুন শুরুর প্রতীক।
বৈশাখ আমাদের শেখায়: পুরোনো ভুল-দুঃখ ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করতে। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩!