সামজীদ হোসেন: বাংলাদেশে গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ ব্যবসার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল বলছেন ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ীরা। কারণ ২০১০ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাড়ির সংখ্যা প্রায় ০.৭ মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক গাড়ির দ্রুত বৃদ্ধিতে আধুনিক, নির্ভরযোগ্য এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর ওয়ার্কশপের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ছোট-বড় প্রায় ৩১ হাজার ওয়ার্কশপ রয়েছে। যেখানে ৩ লাখের বেশি লোক কাজ করে।
গাড়ির মালিকানা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন এবং খুচরা যন্ত্রাংশের চাহিদা বাড়ছে। হাইব্রিড এবং ইলেকট্রিক গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই গাড়িগুলো মেরামত করার জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ান ও বিশেষ ওয়ার্কশপের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুযোগ। সরকারি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুযোগ রয়েছে।
ওয়ার্কশপে গাড়ি মেরামত করতে নিয়ে আসা একজন প্রবীণ গাড়িচালক রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমার বয়স ৫৬ বছর, আমি গাড়ি চালাই ২৯ বছর যাবৎ। আমি অনেক ব্র্যান্ডের গাড়ি চালিয়েছি, অভিজ্ঞতা হয়েছে নানা ধরনের। বর্তমানে একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি চালাচ্ছি। গাড়িটি মেরামত করার জন্য নিয়ে এসেছি ওয়ার্কশপে। আগের মতো এত ঝামেলা পোহাতে হয়নি। বর্তমানে প্রতিটি ওয়ার্কশপে আধুনিকতার ছোঁয়া চলে এসেছে। অত্যাধুনিক সুপার কম্পিউটার দিয়ে গাড়ির সফটওয়্যার লক, ইলেকট্রনিকস ডিভাইসগুলো সহজে কাজ করে ফেলছে। আমাদের মালিকদেরও ভোগান্তি অনেক কমে গেছে। কালের বিবর্তনে ওয়ার্কশপগুলো অনেক আধুনিক হয়েছে। গাড়ির পার্টস থেকে শুরু করে ইঞ্জিনের কাজ সফটওয়্যার, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস , ইঞ্জিনের কাজ, ডেন্টিং পেন্টিংÑ সব কিছু এখন কম্পিউটারাইসড। আগের মতো দিনের পর দিন গাড়ির ত্রুটি ধরার জন্য সময় লাগে না। আমরা স্বস্তিতে দামি দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি সহজে সারিয়ে নিতে পারি।
সরেজমিন ঘুরে ওয়ার্কশপ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি ও নিয়োগে দেশের গাড়ি মেরামত ওয়ার্কশপগুলোতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন মেরামতে প্রশিক্ষিত জনবল অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যেখানে তরুণদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি গ্রাহকসেবার মানও উন্নত হচ্ছে। দক্ষ জনবল গড়ে উঠলে দেশের অটোমোবাইল খাত আরও গতিশীল হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তারা।
আধুনিক ডায়াগনস্টিক টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে অটোমোবাইল মেরামত ওয়ার্কশপগুলোতে সেবার মানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নতুন প্রযুক্তির গাড়ির ত্রুটি দ্রুত ও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে এসব টুলস অপরিহার্য। এতে সময় ও খরচ কমে আসছে, পাশাপাশি গ্রাহক সন্তুষ্টিও বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ইতিমধ্যে উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেছে। এর ফলে দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মেকানিকদের কাজ আরও সহজ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে দেশের অটোমোবাইল খাত অনেক বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সঠিক ও অথেনটিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারের মাধ্যমে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপগুলোতে সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হচ্ছে। নকল বা নি¤œমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারে গাড়ির স্থায়িত্ব কমে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁঁকি বাড়ে। তাই নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। দেশের অনেক ওয়ার্কশপ ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়িয়েছে। এতে গ্রাহকদের আস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে যানবাহনের কর্মক্ষমতা বজায় থাকছে, যা পুরো অটোমোবাইল খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ওয়ার্কশপ মালিকরা।
অনলাইন উপস্থিতি ও গ্রাহকসেবা উন্নত করার মাধ্যমে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকলে গ্রাহকদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়। অনলাইন বুকিং, সার্ভিস আপডেট এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার শুরু করেছে। এতে সেবার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা চালু হলে অটোমোবাইল খাত আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ২৮ মে পর্যন্ত ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি আমদানি হয়েছে ১৬ হাজার ৭৪২টি। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১৮ হাজার ৩৪৯টি। মূলত নতুন গাড়ি আমদানি কমে যাওয়ায় মোট আমদানিতে প্রভাব পড়েছে। পুরোনো গাড়ি আমদানি খুব একটা কমেনি। চার ধরনের বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেঞ্জ রোভার, বেন্টলি, পোরশে ও রোলস রয়েসের মতো দামি গাড়ি। চলতি অর্থবছরের ২৮ মে পর্যন্ত রেঞ্জ রোভার, রোলস রয়েস, বেন্টলি ও পোরশেÑ এই চার ধরনের গাড়ি আমদানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এই চার ব্র্যান্ডের গাড়ি এবার এসেছে ৩১টি। গত অর্থবছর একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৮টি। পুরোনো গাড়ি আমদানি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১,৫১৯টি; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১,৩৩৭টি; ২০২৪-২৫ নতুন আমদানি সংখ্যা ৭,০০০টি। মোট আমদানির প্রায় ৭৫ শতাংশ পুরোনো গাড়ি বাকি ২৫ শতাংশ নতুন গাড়ি। বিলাসবহুল গাড়ির আমদানি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩,০০০টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২,৫০০টি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১,৫০০টি (চলমান)।
মাল্টি ব্র্যান্ড ওয়ার্কশপ লিমিটেডের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর মোহাম্মদ আবুল কালাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমি ১৯৯১ সালে নাভানার মাধ্যমে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে কাজ শুরু করি। পরে আরও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছি প্রায় ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতা। বর্তমানে মাল্টিব্রান্ড ওয়ার্কশপ লিমিটেডের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর।
বাংলাদেশের অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ খাত একটি সম্ভাবনাময় ও ক্রমবর্ধমান শিল্প হিসেবে পরিচিত। দেশে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চাহিদা পূরণে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এখানে কাজ করছে ৩ লাখের ওপরে মানুষ। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ করছে, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইলেকট্রনিকস ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছে দক্ষ টেকনিশিয়ানরা। কাজ করছেন মেকানিক হেল্পার ও অন্যান্য বিভাগে লোকজন।
এই খাতের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। হাজার হাজার তরুণ এখানে কাজ শিখে দক্ষ মেকানিক হিসেবে গড়ে উঠছে। অনেকেই নিজের উদ্যোগে ওয়ার্কশপ গড়ে তুলে উদ্যোক্তা হয়ে উঠছে, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। উন্নত যন্ত্রপাতি, কম্পিউটারাইজড ডায়াগনস্টিক সিস্টেম এবং নতুন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওয়ার্কশপগুলো আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে গ্রাহকরা পাচ্ছেন আরও উন্নত ও নির্ভরযোগ্য সেবা। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সার্ভিসিং ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে যানবাহন নিরাপদ রাখা সম্ভব হচ্ছে, যা দুর্ঘটনা কমাতে সহায়তা করছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ খাত অর্থনীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ভবিষ্যতে আরও বড় অবদান রাখবে বলে আশা করি। তবে সরকারের সহযোগিতা পেলে অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি সম্ভাবনাময় খাত হয়ে দাঁড়াবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।