গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’ এর কবরকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনাটি এখনো সবার মুখে মুখে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, কবর থেকে লাশ উত্তোলন ও পোড়ানো- সবকিছু মিলিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিভীষিকাময় ঘটনা হিসেবে এটি চিহ্নিত হয়েছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মোট ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু এরই ফাঁকে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি মামলা বাণিজ্যে মেতে ওঠায় সাধারণ মানুষ নতুন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
মামলা বাণিজ্যের শিকার সাধারণ মানুষ:
গোয়ালন্দ পৌরসভার আদর্শগ্রামের বাসিন্দা মাওলানা আল আমিন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ দিন কাটাচ্ছেন। পিতা মৃত মোহাম্মদ আলী শেখ ও মাতা মোছা. রাহেলা বেগমের সন্তান আল আমিন পেশায় একজন ধর্মপ্রচারক।

গোয়ালন্দ আদর্শগ্রামের বাসিন্দা মাওলানা আল আমিন
তিনি বলেন- আমি আদর্শগ্রামের একজন সাধারণ মানুষ এবং পেশায় একজন ধর্মপ্রচারক। ঘটনার দিন আমি বিক্ষুব্ধ জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, মৃত মানুষের লাশ কবর থেকে উত্তোলন কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়। আমি যেহেতু একজন মাওলানা, আমার দায়িত্ব ছিল মানুষকে সঠিক ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া। সেই উদ্দেশ্যেই আমি বুঝিয়েছি- কবর খুঁড়ে লাশ উত্তোলন ইসলাম অনুমোদন করে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন- অথচ আজ আমাকেই দোষী বানানোর চেষ্টা চলছে। এলাকার মানুষ হওয়া এবং দাঁড়ি-টুপি পরিধান করার কারণে আমাকে সন্দেহভাজন করা হচ্ছে। মামলা বাণিজ্যের অসাধু চক্র আমার নাম জড়ানোর ষড়যন্ত্র করছে। ইতিমধ্যেই পুলিশ আমার বাড়িতে গেছে এবং আমি টানা ২৪ দিন ধরে পরিবার-পরিজন থেকে দূরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বিনীত অনুরোধ জানাই- আমাকে যেনো ষড়যন্ত্র করে হয়রানি না করা হয়।
ভয় ও আতঙ্কে গ্রামীণ জনজীবন:
নুরাল পাগলার দরবারে ঘটনার পর থেকে শুধু আল আমিন নন, এলাকার অনেক সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, নির্দিষ্ট অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পরিবর্তে সুবিধাবাদীরা মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে নির্দোষ মানুষকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যারা দাঁড়ি-টুপি পরিধান করেন বা ধর্মীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এমন পরিস্থিতিতে নির্দোষ মানুষদের মনে গভীর ভীতি কাজ করছে। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার গোপনে রাত কাটাচ্ছেন, যেনো অকারণে গ্রেপ্তার না হন।
মামলার অগ্রগতি:
নুরা পাগলার দরবারে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও লাশ উত্তোলনের ঘটনায় নিহত রাসেল মোল্লার বাবা সাবেক ইউপি সদস্য আজাদ মোল্লা বাদী হয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর আরও একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় এখন পর্যন্ত রাসেল মণ্ডলসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে দায়েরকৃত আরেকটি মামলায়ও গ্রেপ্তার করা হয় ১৬ জনকে। ফলে দুটি মামলায় গ্রেপ্তারকৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে।
মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ:
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি হলেও মামলা বাণিজ্যের নামে নির্দোষদের হয়রানি অমানবিক। তারা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন যেনো প্রত্যেকটি মামলা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে মামলা দিয়ে নির্দোষদের ভয় দেখানো বা আর্থিক ফায়দা লুটে নেওয়া চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
রাজবাড়ির এই ভয়াবহ ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাক- এটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। তবে এর ফাঁকে যদি মামলা বাণিজ্য ও হয়রানির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আস্থা হারাবে মানুষ। সাধারণ নির্দোষ দাড়ি-টুপি পরিহিত মুসুল্লি বা মাওলানাদের যদি কেবল সন্দেহের বশে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে ন্যায়বিচারের বদলে আতঙ্কই ছড়িয়ে পড়বে গ্রামে গ্রামে। তাই সময় এসেছে- মামলা বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার।

গোয়ালন্দ আদর্শগ্রামের বাসিন্দা মাওলানা আল আমিন