• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

৬০০ টাকায় জীবন চলে না, দিনমজুরদের আহাজারি

মতিন সাগর / ২৬ বার পড়া হয়েছে
প্রকাশ সময় : শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যখন প্রতিদিনই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে, তখন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষরা। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সর্বত্র একই চিত্র-অপ্রতিরোধ্য দ্রব্যমূল্যের কারণে শ্রমজীবী মানুষদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।

রাজধানীর দক্ষিণখান থানার আশকোনা এলাকায় দেখা মেলে দিনমজুর কাজী মোর্শেদের। বয়স ৩৮ বছর। ভোরে বের হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম দিয়ে দিনে ৬০০ টাকা রোজগার করেন তিনি। কিন্তু এই আয় দিয়ে পরিবার চালানো তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মোর্শেদ বলেন,
“আমার পরিবারে পাঁচজন সদস্য। প্রতিদিন ভোরে কাজের জন্য বের হই, কিন্তু ৬০০ টাকা দিয়ে সংসারের খরচ মেটানো যায় না। চাল, ডাল, তেল কিনলেই অর্ধেক টাকা শেষ হয়ে যায়। এখন বাজারে আলু-পেঁপে ছাড়া অন্য কোনো সবজি ৮০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। মাছ-মাংস তো আমাদের জন্য বিলাসিতা।”

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন কাজ করা সম্ভব হয় না। শরীরের বিশ্রামও প্রয়োজন। কিন্তু কোনোদিন যদি কাজ না মেলে, সেদিন পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলে না। “আমরা তো মানুষ, রোবট না। সপ্তাহে এক-দুই দিন বিশ্রাম না করলে শরীর ভেঙে পড়ে। কিন্তু বিশ্রাম নিলে তো সংসার চলে না,” বলেন তিনি।

শুধু খাদ্য দিয়ে জীবন চলে না, জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতেও খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা- সবকিছুর চাপ একই সঙ্গে বহন করা দিনমজুরদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। কাজী মোর্শেদ বলেন,
“বাচ্চাদের স্কুলের ফি দিতে পারি না। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোও কঠিন হয়ে যায়। ঔষধের দাম এত বেশি যে সাধ্যের বাইরে।”

মোর্শেদের মতো কষ্টের গল্প শোনা যায় একই এলাকার আরও অনেক দিনমজুরের মুখে। তারা জানান, দৈনিক আয়ের তুলনায় বাজারদর এত বেড়ে গেছে যে সংসার চালাতে গিয়ে তাদের প্রায়ই ধার-দেনায় পড়তে হয়।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজ সচেতন মহলের মতে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা বলছেন, দেশের প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের জীবনযাত্রার মান যদি ন্যূনতম পর্যায়েও নিশ্চিত না হয়, তবে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে।

আশকোনার স্থানীয় স্কুলের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“দিনমজুররা হচ্ছে অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তারা প্রতিদিন শহর ও গ্রামের উন্নয়নকাজে শ্রম দিচ্ছেন। অথচ তাদের জীবনমান এত নিচে নেমে গেছে যে তারা এখন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছেন। সরকারের উচিত দ্রুত খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামানো এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা চালু করা।”

এদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও বারবার দাবি উঠেছে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর জন্য। তাদের অভিযোগ, বর্তমান আয় দিয়ে শ্রমিকরা কেবল খাদ্যের খরচই মেটাতে পারেন, অন্য কোনো প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না।

কাজী মোর্শেদ ও তার মতো লাখো দিনমজুরের একটাই আবেদ- “আমরা গরিব, কিন্তু মানুষ। আমাদের বাঁচতে দিন।”

এমন আর্তনাদ শুধু আশকোনার দিনমজুরের না, সারা দেশের প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে না ধরলে এবং দিনমজুরদের জন্য টেকসই সহায়তা না দিলে সামনে আরও ভয়াবহ সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরোও খবর
April 2026
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
April 2026
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031