নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা ও বনশ্রী এলাকায় সুজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে আতঙ্ক সৃষ্টি করার অভিযোগ উঠেছে। বাড্ডার স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে সুজন বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন। সেই অর্থ ব্যবহার করে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তার প্রভাববলয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং কিশোর গ্যাং পরিচালনার মতো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।
রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় একটি জমি-সংক্রান্ত ব্যবসায়িক লেনদেনকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়ম, অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ এবং মামলা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনজন অভিযোগকারী। রূপালী বাংলাদেশ প্রতিনিধির কাছে সাক্ষাৎকার দেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগকারী মো. হাবিব (পিতা: নাসির উদ্দিন), মো. রফিক (পিতা: ওহাব মোল্লা) এবং মিজানুর রহমান দিপু (পিতা: খলিলুর রহমান) বলেন, ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সূত্র ধরে তারা জমি ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন আর্থিক বিরোধের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং আইনি জটিলতায় পড়েন।
অভিযোগকারী মো. হাবিবের ভাষ্য অনুযায়ী, সুজনের সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তারা জানান, দক্ষিণ বনশ্রীর একটি মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় তারা যৌথভাবে একটি অফিস ভাড়া নিয়ে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তাদের দাবি, ওই অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভাড়ার নথিপত্র সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করলে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও অংশীদারত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
বক্তব্যে অভিযোগকারীরা বলেন, মোফাজ্জল নামে এক ব্যক্তির কাছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় একটি জমি বিক্রির লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। তাদের দাবি, জমির মূল্য, অংশীদারদের পাওনা এবং আর্থিক হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে সবার কাছে একই তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে অংশীদারদের মধ্যে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয় এবং তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন, বায়নাপত্র, ব্যাংক হিসাব, বিক্রয় দলিল এবং অন্যান্য নথি তদন্তের আওতায় আনা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। তারা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার প্রতি এসব নথি সংগ্রহ করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার আহ্বান জানান। তারা আরও দাবি করেন, জমি-সংক্রান্ত একটি মামলাকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের ঘটনাও তদন্তের দাবি রাখে। তাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের উৎস ও প্রকৃতি খতিয়ে দেখা হলে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
অভিযোগকারী মো. রফিক বলেন, ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে সুজন বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন। সেই অর্থ ব্যবহার করে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছেন। তার প্রভাববলয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং কিশোর গ্যাং পরিচালনার মতো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।
বনশ্রী এলাকার এক বাসিন্দা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সুজন আগে জমি কেনাবেচার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার আর্থিক প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এরপর থেকে এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে অস্ত্রের মহড়া দেওয়ার মতো নানা গুরুতর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কিছু নারীকে জোরপূর্বক তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। রামপুরা, বাড্ডা ও বনশ্রী এলাকায় সুজন এখন আতঙ্কের একটি নাম।
একই ধরনের অভিযোগ করেন বাড্ডা এলাকার এক ব্যবসায়ী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমানে এলাকায় প্রভাবশালী গডফাদার হিসেবে সুজনের একটি বলয় তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের সঙ্গেও জড়িত। তার কিছু মাদকাসক্ত লোক রয়েছে, যাদের দিয়ে তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে থাকেন। বিষয়গুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসলেও সুজন ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।
অভিযোগকারীরা বলেন, এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার। তারা আশা করেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে সুজনসহ তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনা হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক অংশীদার মিজানুর রহমান দিপু জানান, ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে আমি ও আমার পার্টনাররা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং আদালতের প্রতি আমরা পূর্ণ আস্থা রাখি। আমাদের প্রত্যাশা, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হোক এবং দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হোক।
এছাড়াও তারা প্রতিনিয়ত আমাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এর ফলে আমরা সুজন ও তার বাহিনীর ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি না। অভিযোগকারীরা আরও জানান, এই ঘটনায় আরও কয়েকজন ব্যক্তির নাম তাদের অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তবে তারা বলেন, কোনো ব্যক্তিকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা চাই অভিযুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ, দলিল এবং অন্যান্য নথি উপস্থাপন করতে প্রস্তুত রয়েছেন। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেন, তদন্তকারী সংস্থা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, নথিপত্র যাচাই এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য সংগ্রহ করতে চেষ্টা করেও রূপালী বাংলাদেশ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি সুজন নামের এই সন্ত্রাসী। তবে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।