• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৭ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান কুমিল্লায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে এক রাতেই ৬২৪ জন আটক ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক বিএডিসির মেগা প্রকল্প: বদলে যাচ্ছে সিলেটে ১৭ হাজার হেক্টরের কৃষি ও হাওরের অর্থনীতি ক্ষমতার গিরগিটি বদলে পার পেয়ে যাচ্ছেন ‘রিক্সা বশির’! ট্রাম্পের নৈশভোজসহ প্রথম দিনে ১০ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ সিএমপি কোতোয়ালী থানার বিতর্কিত ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইত্যাদি এবার নকশিকাঁথার জামালপুরে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বিএডিসির মেগা প্রকল্প: বদলে যাচ্ছে সিলেটে ১৭ হাজার হেক্টরের কৃষি ও হাওরের অর্থনীতি

দুলাল সরকার / ১৭ বার পড়া হয়েছে
প্রকাশ সময় : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দুলাল সরকার: হাওর, নদী, খাল আর পাহাড়ি ছড়ায় ঘেরা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের জনপদ সিলেট বিভাগ। পানি প্রাচুর্য ও উর্বর কৃষিজমি থাকা সত্ত্বেও ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও সেচ সুবিধার অভাবে এ অঞ্চলে কৃষির সম্ভাবনা দীর্ঘদিন পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাবে বছরের পর বছর অনাবাদী থেকে যায় প্রায় ৩ লক্ষ হেক্টর জমি। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা ও আগাম বন্যা কৃষকের কষ্টের ফসলকে করে তোলে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

​এই অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং সিলেটের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। সংস্থাতার বাস্তবায়নাধীন ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’-এর আওতায় বিস্তৃত পরিসরে খাল-ছড়া পুনঃখনন, পরিবেশবান্ধব সেচ অবকাঠামো নির্মাণ ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি প্রসারের মাধ্যমে ১৭,০১৯ হেক্টর অনাবাদী ও পতিত জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।

​শুষ্ক মৌসুমে সেচ ও বর্ষায় পানি নিষ্কাশন: এক প্রকল্পে জোড়া সমাধান

​প্রকল্পটির মূল কৌশল হলো ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খাল, নালা ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন ও সংস্কারের মাধ্যমে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা।

১. বর্ষার পানি সংরক্ষণ ও জলাবদ্ধতা নিরসন: খাল/নালা/পাহাড়ি ছড়া খননের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

২. ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা (Buried Pipe Line): উন্মুক্ত নালার বদলে মাটির নিচে পাইপলাইন (ব্যারিড পাইপ লাইন) দিয়ে সরাসরি কৃষকের জমিতে পানি পৌঁছানো হচ্ছে। এতে পানির অপচয় কমার পাশাপাশি সেচ দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৩. আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষা: খালের নাব্যতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চৈত্র-বৈশাখ মাসের আগাম পাহাড়ি ঢলের হাত থেকে কৃষকের বোরো ফসল রক্ষা পাচ্ছে।

​২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তব অগ্রগতি ও সাফল্য

​প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অতি সম্প্রতি সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাঠপর্যায়ে সেচ অবকাঠামো ও কৃষি উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে:

​১৪৫ কিমি খাল ও ছড়া খনন: নদী ও হাওরের নাব্যতা ফেরাতে ১৪৫ কিলোমিটার খাল ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন ও সংস্কার করা হয়েছে। এর ফলে সরাসরি ১,৪৫০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হয়েছে এবং ৪,২৮০ হেক্টর জমির দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা নিরসন হয়েছে।

​নৌচলাচল ও মৎস্য অভয়ারণ্য: খাল খননের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরাঞ্চলে নৌচলাচল সহজ হয়েছে এবং কৃষকগণ সহজে নৌকার মাধ্যমে ফসল পরিবহন করতে পারছেন। পাশাপাশি এসব পুনঃখননকৃত জলাশয়ে দেশীয় মাছের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে।

​২৭৭.৬ কিমি ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইন ও সেচযন্ত্র: ৬৯টি আধুনিক সেচযন্ত্র সরবরাহ এবং ২৭৭.৬ কিলোমিটার ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণের ফলে ২,৯৫৫ হেক্টর অনাবাদী জমি সেচের আওতায় এসেছে। এতে সেচের পানির অপচয় রোধের পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

​৮ কিমি ‘গোপাট’ ও আগাম বন্যা মোকাবিলা: বোরো ফসল দ্রুত কেটে ঘরে তোলার সুবিধার্থে ৮ কিলোমিটার ‘গোপাট’ (ফসল পরিবহনের পথ) নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে ৪,০৫০ হেক্টর জমির ফসল দ্রুত পরিবহন করা সম্ভব হয়েছে এবং আগাম বন্যার হাত থেকে প্রায় ৫,৪০০ জন কৃষকের ফসল রক্ষা পেয়েছে।

​থ্রেশিং ফ্লোর নির্মাণ: পাহাড়ি ঢল আসার আগেই ধান দ্রুত মাড়াই, শুকানো এবং নিরাপদে ঘরে তোলার জন্য কৃষকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে পাকা থ্রেশিং ফ্লোর।

​কৃষক প্রশিক্ষণ: স্থানীয় পর্যায়ে সেচযন্ত্র পরিচালনা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনার ওপর ২৭০ জন কৃষক ও পাম্প অপারেটরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

​প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য

​এ বিষয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী প্রনজিত কুমার দেব জানান, “সিলেট বিভাগে বিভিন্ন মৌসুমে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদী থাকে। এসব অনাবাদী ও পতিত জমি চাষের আওতায় আনতে বর্তমান সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি সেচের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।”

​তিনি আরও বলেন, “ইতোমধ্যেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ধাপে ধাপে বাকী জমিগুলোকেও আধুনিক সেচের আওতায় আনা হবে। এছাড়া সেচ খরচ কমাতে ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারে সৌরশক্তি চালিত সেচ পাম্প (Solar Pump) স্থাপনের বৃহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার।”

​খাদ্য নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধ কৃষির অঙ্গীকার

​সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীদের মতে, বিএডিসির এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষক-কৃষাণীদের প্রশিক্ষণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সেচ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং আত্বকর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

​পানির প্রাচুর্যে ভরা সিলেট অঞ্চলে পরিকল্পিত পানি ব্যবহারের মাধ্যমে অনাবাদী প্রান্তরগুলো এখন সোনালী ফসলে ভরে উঠছে। হাওর ও পাহাড়ি জনপদের কৃষকদের শ্রমের সাথে আধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনার এই মেলবন্ধন কেবল স্থানীয় কৃষি উৎপাদনকেই বাড়াবে না, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর

ফেসবুকে আমরা