সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ছে মাদকের বিষ ! মাদক এখন গ্রাম থেকে শহরে—শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে ও মিলছে মাদক! নেশার অন্ধকারে ডুবছে প্রজন্ম: আসক্তির ফাঁদে শিশু-কিশোর , আর রিহ্যাবের চিকিৎসার নামে চলছে রমরমা বাণিজ্যের মহোৎসব ! নিরব গণ-ধ্বংসের পথে সমাজ।
মাদক আর নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এটি এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত এক সর্বগ্রাসী বিষ। শিশু-কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—সবাই ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে এই অন্ধকার জালে। প্রতিদিন বাড়ছে মাদকের বিস্তার, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আসক্তির সংখ্যা—যা রূপ নিচ্ছে এক নীরব সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞে। বাস্তবতা এখন ভয়াবহ—আদরের সন্তান মাদকের ছোবলে হয়ে উঠছে অচেনা ও হিংস্র। পরিবারে নেমে আসছে অশান্তি, ভাঙন ও আতঙ্ক। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান—সবাই হারাচ্ছে তাদের প্রিয় মানুষকে। এই ধ্বংস যেন ধীরে ধীরে একটি প্রজন্মকে গ্রাস করছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—মাদক প্রবেশ করেছে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে এই নেশায়। সহপাঠী ও বন্ধুমহলের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ছে এই বিষ, যার পেছনে সক্রিয় রয়েছে এলাকাভিত্তিক ক্ষুদ্র ডিলার চক্র—যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নীরব ঘাতক। আসক্তির টাকার জন্য শিক্ষার্থীরা পরিবার থেকেই চুরি করছে, এমনকি মায়ের গহনা বিক্রি করতেও দ্বিধা করছে না। একটি পুরো প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে, আর পরিবারগুলো অসহায় দর্শক হয়ে দেখছে সেই পতন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বেশ কিছু রিহ্যাব সেন্টারগুলোর কারণে। শেষ আশ্রয় ভেবে সেখানে চিকিৎসায় পাঠিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। বরং চিকিৎসার নামে দীর্ঘমেয়াদী প্রোগ্রামে আটকে রেখে মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ অদক্ষ কর্মীদের মাধ্যমে চলছে দ্বিমুখী কাউন্সেলিং ও বিভ্রান্তিকর পদ্ধতির মাধ্যমে রোগী ও পরিবার—উভয়কেই পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে মানসিকভাবে জিম্মি করে গড়ে তোলা হয়েছে এক ভয়ংকর বাণিজ্যচক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই লোমহর্ষক নীরব গণহত্যার ভয়ংকর চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যেখানে একসময়ের স্বতঃস্ফূর্ত হাসিখুশি পরিবারগুলো আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে বুকভাঙা আর্তনাদে প্রতিনিয়ত চিৎকার করছে ।
বিশেষজ্ঞ মতামত:
একজন অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) জানান, “মাদকাসক্তি শুধুমাত্র একটি অভ্যাসগত সমস্যা নয়, এটি একটি জটিল মানসিক রোগ। কিশোর বয়সে মস্তিষ্ক বিকাশমান থাকে, ফলে খুব দ্রুত তারা আসক্ত হয়ে পড়ে। সঠিক চিকিৎসা ও পারিবারিক সহায়তা না পেলে এটি সহিংস আচরণ, অপরাধপ্রবণতা ও আত্মবিনাশী প্রবণতায় রূপ নিতে পারে।”
অন্যদিকে একজন সমাজবিদের মতে:
“মাদকের এই বিস্তার শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজ কাঠামোর ব্যর্থতার প্রতিফলন। যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই এমন মহামারী আকারে মাদক ছড়িয়ে পড়ে। আর এর সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠে রিহ্যাব ও ডিলারকেন্দ্রিক একটি লাভজনক অপরাধ অর্থনীতি।”
এই প্রতিবেদন কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়—এটি এক ভয়ংকর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন এখন একটাই “আমরা কি এখনো জাগবো, নাকি এই নীরব ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়েই থাকবো?”