ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক পরপরই টাইমস স্কয়ারে লা রোহা ভক্তদের উদযাপন শুরু হয়ে যায়।
২৬ বছর গড় বয়সের একটি জাতীয় দল এবং ১৯ বছর বয়সী ‘প্লাটিনাম-ফুটেড’ ফরোয়ার্ড লামিন ইয়ামালকে সামনে রেখে স্প্যানিশ ফুটবলের এক নতুন সোনালি যুগের সূচনাই যেন নির্দেশ করছে এ জয়।
‘এটা যেন নিয়তি,’ ভাবছিলেন ৩৩ বছর বয়সী জোয়ান ওয়াসন। সদ্য তরুণ লিওনেল মেসির কোলে শিশু ইয়ামালের সেই ভাইরাল ছবির মধ্যে এক ধরনের প্রতীকী অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘মেসির লামিনকে (ইয়ামাল) গোসল করানোর সেই ছবিটা ছিল; আর এখন তিনি তার হাতে ট্রফি তুলে দিচ্ছেন।’
তবে এটা বলতেই হবে, ফাইনালটা মোটেও সহজ ছিল না। স্পেন হয়ত বলের দখলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং সুযোগ তৈরির দিক দিয়ে আর্জেন্টিনার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ছিল, কিন্তু মেসি-নেতৃত্বাধীন দলটি নিজেদের এক নাছোড়বান্দা প্রতিপক্ষ হিসেবেই প্রমাণ করেছে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিক পর্যন্ত স্কোরলাইন গোলশূন্য (০-০) ধরে রেখেছিল তারা।
এমনকি ৯৩ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড, যা আর্জেন্টিনাকে ১০ জনের দলে পরিণত করেছিল, সেটাও আলবিসেলেস্তেদের জন্য তাৎক্ষণিক পতনের ঘণ্টা বাজাতে পারেনি। সেই মুহূর্তটি আসে আরও ১৩ মিনিট পর, ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের করা গোলের মাধ্যমে।
ইংল্যান্ড থেকে আসা আজীবন স্পেন সমর্থক ২৭ বছর বয়সী চার্লি ওয়েবস্টার বলেন, ‘স্পেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাদের জয়টাই প্রাপ্য ছিল, কিন্তু আর্জেন্টিনা জানে কীভাবে ম্যাচ বের করে আনতে হয়। আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম, কারণ খেলা যদি পেনাল্টিতে গড়ায়, তবে সেটা লটারির মতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যে দলই খেলুক না কেন, প্রতিটি ম্যাচে তাদের যে পরিমাণ সমর্থক থাকে, তাতে প্রতিপক্ষ সংখ্যায় পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু সেরা দলটিই জিতেছে।’
স্পেনের ম্যাচ দেখতে নিজ দেশ থেকে উড়ে আসা ৪২ বছর বয়সী সারে মনজোনের কাছে, এ জয় তার দেশের জন্য আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে।
২৩ বছর বয়সী মিডফিল্ডার পেদ্রি এবং ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবারসিকে নিয়ে গড়া স্পেনের এই তরুণ দল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের নিয়ে ভীষণ, ভীষণ গর্বিত।’
‘আমার মনে হয় একটি দেশ হিসেবে আমাদের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তারা সেটারই প্রতিনিধিত্ব করছে। স্প্যানিশ মানুষ কেমন, তারা তার একটি অংশকে তুলে ধরে।’
খেলা দেখতে স্পেন থেকে আসা আরেক সমর্থক ব্রায়ান ল্যাসি ফুটবল প্রতিভার এ পালাবদল দেখছেন অন্যভাবে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি প্রজন্মের শুরু। এটি একটি প্রজন্মগত পরিবর্তন, কারণ মেসির অধ্যায় এখন শেষ, আর এখন লামিন ইয়ামালের সময়।’
‘এরপর কী?’ বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন তার। ‘ইউরো? পরবর্তী বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ?’
তিনি বলেন, ‘খেলাধুলার দুনিয়ায় ফুটবলের অবস্থান সবার ওপরে। আর স্পেন এখন সেই বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে।’
‘আমাদের উদযাপন করতে হবে। অতীতের দিকে না তাকিয়ে, ভবিষ্যতের কথা না ভেবে, শুধু এটুকু দেখা উচিত যে আমরা এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’
এক যুগের অবসানে আর্জেন্টিনার ভক্তদের ভাবনা
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার ভক্তরা শুধু চ্যাম্পিয়নশিপ হারানোর বেদনাই নয়, বরং দেশকে তার ফুটবলের সোনালি দিনে ফিরিয়ে আনার কারিগর হিসেবে স্বীকৃত এক মহাতারকার প্রায় নিশ্চিত বিদায়ের বিষয়টিও মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
টাইমস স্কয়ারে হাতে একটি মেসির পুতুল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন লিলি নামের এক আর্জেন্টাইন ভক্ত, যিনি নিজের পদবি প্রকাশ করতে চাননি।
ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সে যা করেছে, তা কেউ করতে পারেনি, এমনকি পেলেও নয়। পেলে কেবল দুবার ফাইনালে খেলেছেন; মেসি আমাদের তিনটিতে নিয়ে গেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সে আমাদের অনেক আনন্দ দিয়েছে।’
নিউজার্সির বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত মারভিন রেয়েসের মতে, জাতীয় দলে মেসির ভূমিকা ছিল পুরোপুরি রূপান্তরকারীর মতো, যিনি ২০২২ সালে কাতারে ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ খরা ঘুচিয়েছিলেন।
‘জাতীয় দলের জন্য সে কী করেছে?’ নিজেই প্রশ্ন করে তিনি উত্তর দেন, ‘সবকিছু।’
রেয়েস বলেন, ‘সে তাদের আশা জুগিয়েছে এবং অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। সে সত্যিই দলটাকে নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে গেছে।’
আর্জেন্টিনা থেকে আসা ৪৮ বছর বয়সী হোয়াকিন মার্টিনেজ বলছিলেন, তার ১২ ও ১১ বছর বয়সী দুই ছেলে মেসি ছাড়া দলের অন্য কোনো নেতাকে চেনে না।
১৯৮৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ডিয়েগো ম্যারাডোনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ম্যারাডোনাই ছিল সব, কিন্তু আমার সন্তানদের কাছে সেটা মেসি।’
তিনি বলেন, ‘মেসি তো মেসিই। যেহেতু মেসি আর থাকবেন না, তাই এখন দলকে অনেক কাজ করতে হবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আজকের ম্যাচের পর অবশ্যই আমাদের খারাপ লাগছে। তবে এটাই তো ফুটবল।’