নিজস্ব প্রতিবেদকঃ অনলাইন টিকেটিং সার্ভিস সহজ ডট কমের (Shohoz.com) ভয়াবহ প্রতারণায় চরম দুর্ভোগে পড়েছিলো কুরবানীর ঈদে বাড়ি ফেরা অসংখ্য মানুষ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনা এবং অনলাইনে ই-টিকেটিং সিস্টেমের আড়ালে পরিচালিত অপরাধমূলক সিন্ডিকেট সম্পর্কে জানা নেই খুব কম মানুষ আছে। সহজ-সিনেসিস’ জয়েন্ট ভেঞ্চার (JV)-এর অধীনে পরিচালিত ই-টিকিটিং ব্যবস্থাটি বর্তমানে কেবল অকার্যকর নয়, বরং সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটার একটি ডিজিটাল অস্ত্র এবং কালোবাজারিদের প্রধান কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক বিষয় হলো পরিকল্পিত ব্যর্থতা' এবং 'ডিজিটাল সিন্ডিকেটে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অবৈধ উপায়ে লক্ষ গ্রাহকের অর্থ লুটিয়ে নেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির মূললক্ষ্য।
যে প্রতিষ্ঠানটি রেলওয়ের টিকিট স্বচ্ছতার সাথে বিক্রির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেই ‘সহজ’-এর কর্মীরাই খোদ টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন যাহা বিভিন্ন গনমাধ্যমে ঢালাও ভাবে প্রচার হয়েছে। তবুও থেকে নেই সহজ ডট কম এর প্রতারণা।
কুরবানের ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় অনেকে অনলাইনে অগ্রিম টিকেট কিনেছেন সহজ ডট কম থেকে। অনলাইনে
টাকা কেটে নিয়ে গেলেও বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখে টাকা বাস কর্তৃপক্ষের কাছে পেমেন্ট হয়নি। ঠিক সেই সময়ে ভোগান্তিতে পড়ে ছিলো হাজার হাজার ঈদে ঘরফেরা মানুষ।
কয়েকজন ভুক্তভোগীর সাথে কথা বললে তারা জানান সহজ ডট কম থেকে ঢাকা থেকে বগুড়া-নওগাঁগামী ব্লু-লাইন এক্সপ্রেসের বাসের টিকেট কেটে প্রতারণার শিকার হন। ঈদের বাড়ি যাওয়ার সময় গত ১৯ মার্চ সকাল ৯টার নির্ধারিত বাসের টিকেট পাঁচদিন আগে কেটে রাখি বাসে উঠার আধঘন্টা আগে সকাল সাড়ে আটটায় বাতিল করে মেসেজ পাঠায় সহজ ডট কম। তবে সর্বশেষ সহজ ডট কম থেকে টিকেট করা কোন যাত্রীই শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারেননি। তবে এ বছরই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার ট্রেন ও বাসের অনলাইন টিকেট নিয়ে সহজ ডট কমের বিরুদ্ধে হাজারও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।
নামপ্রকাশে অনুচ্ছুক সহজ ডট কম এর এক কর্মকর্তা জানান প্রতিদিন সহজ ডট কম থেকে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ গ্রাহক টিকেট কিনেন অনলাইনে সহজ ডট কম এর সার্ভার থেকে । ঈদ সহ বিভিন্ন ছুটির দিনে তা হয় দ্বিগুন। যদিও সহজ ডট কমের নিজস্ব সার্ভারে টিকেট বিক্রিয় সকল তথ্য থাকলে ও সরকার’কে দেখানো তার চার ভাগের একভাগ । সর্বনিম্ম টিকেটের মূল্য ৩০০ টাকা সর্বোচ্চ টিকেটের মূল্য ২২০০ টাকা।
যাতে করে সরকার প্রতিনিয়ত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সহজ ডট কম থেকে। বিষয়টি এনবিআর সহ সরকারী রাজস্ব আদায়ের কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগ আছে, সিনেসিস আইটিসহ এই জেভি-ভুক্ত প্রতিষ্ঠান সাবেক আইন মন্ত্রী আনিসুল হকের আপন ছোট ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান সেই সুবাধে এই কোম্পানীর একটা আয়ের লভ্যাংস সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়ের কাছে যায়,যাহা এখন ও চলমান আছে। সেই সুবাধে স্বৈরাচার আমলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যেমন খুশি তেমন ভাবে প্রতিষ্ঠান টি গ্রাহকের সাথে প্রতারনা করে আসছে। লাগামহীন দুর্নীতি ও অতিরিক্ত চার্জে নাকাল রাজধানীবাসী। সহজের পুরো সিন্ডিকেটটি বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট এবং দোসরদের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছিল।
সিনেসিস আইটিসহ এই জেভি-ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবে রেলওয়ের মতো সংবেদনশীল খাতের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে ‘সার্ভিস চার্জ’ বা ‘কনভিনিয়েন্স ফি’-এর নামে যে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে, তা মূলত এই ডিজিটাল লুটপাটেরই অবৈধ অংশ। কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই গ্রাহকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে ঘটছে বলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রেলওয়ের মর্যাদা ও জনস্বার্থ রক্ষায় খুব দ্রুত সময়ে গুরুত্ব পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা রাজধানীবাসীসহ দেশের আপামর জনগন’কে রক্ষার জোর দাবি জানাচ্ছে সচেতন মহল।রেলওয়ে সহ সরকারী সকল চুক্তি বাতিল করে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্ত করে সহজ-সিনেসিস’ জেভি-এর সাথে যেসব অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মীর বিরুদ্ধে কালোবাজারির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরী।
রাজনৈতিক সিন্ডিকেট চিহ্নিতকরণ বিগত সরকারের আমলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে একক নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার পেছনে কার কার রাজনৈতিক মদদ ছিল, তা খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বিকল্প স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি টিকিটিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ যাত্রীরা কোনো সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি থাকতে না হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এবং রেল বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন,রেলওয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম হওয়া উচিত কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগীদের ব্যবসার জায়গা রেলওয়ে হওয়া উচিত নয়।সকল ডিজিটাল সিন্ডিকেট ভেঙে রেলওয়ে জনগনের সহজলভ্য ও নিরাপদ যাতায়ত মাধ্যম করতে হবে তা না পারলে রেলওয়ের প্রতি জনমনে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হবে না।সেই সাথে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গ্রাহকের অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহজ ডট কমের দায়িত্বশীল একাধিক ব্যক্তিকে ফোন করা হলেও কেউ ফোন ধরেনি। সহজ ডট কমের হট লাইন নম্বরে চার দফা ফোন দিয়েও কোন কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধির সংযোগ পাওয়া যায়নি।