ভারতীয় উপমহাদেশে বিখ্যাত দার্শনিক ও প্রথম ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক হজরত ডিপুটি শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ) ভারতীয় সভ্যতার স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক বীর সৈনিক এ চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান। তাদের মধ্যে অন্যতম ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হলেন হজরত ডিপুটি শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ)। বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী যখন অত্যাচার- নির্যাতন বাড়িয়ে মানুষকে পশুর মতো ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়েছে তখনই আমাদের কৃতী পুরুষগণ আগুনের ন্যায় জ্বলে উঠেছে। প্রতিবাদের অপরাধে জীবন দিতে হয়েছে অনেককে। চাকরিচ্যুতি কোন ব্যাপার নয়। বৃটিশদের দাবানলের সামনে প্রকাশ্য কলম যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া মহানায়ক হলেন- ডিপুটি শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম, মাওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা আবদুর রশিদ সিদ্দিকী, কাজেম আলী মাস্টার, হাকিম আলতাফুর রহমান (গান্ধীজী), ছৈয়দ মৌলভী সোলতান, মাওলানা আবদুল হাই, সীতাকুন্ডের বড় মাওলানা প্রমুখ মনীষীগণ সরাসরি কলম যুদ্ধে লিপ্ত হন। বীর মাস্টারদা সূর্যসেন ও তাঁর সৈন্য সেনারা সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
ভারতীয় স্বাধীনতায় আরো যারা অতি গুরুত্ব সহকারে বৃটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তারা হলেন- মাওলানা ইসমাইল শহীদ, মওলভী আবদুল হাই, গাজী মাওলানা রশিদ আহমদ, গাজী মাওলানা ফজলুল হক, মাওলানা আহমদুল্লাহ্, চট্টগ্রামের গাজী মওলানা শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ নিজামপুরী, মাওলানা গাজী শরিয়ত উল্লাহ্, মাওলানা বরকত উল্লাহ্, মাওলানা ইমামুদ্দিন, মাওলানা মাহমুদুল হাছান, মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ, মাওলানা বরকত উল্লাহ্, মাওলানা ওবাইদুল্লাহ্ প্রভৃতি আলেমগণ মহান স্বাধীনতার দাবি নিয়ে দেশ হতে দেশান্তরে হিজরত করেন। বহু আলেম সমাজের প্রতিনিধির ফাঁসি হয়, অনেকের মানবহীন দ্বীপে যাবজ্জীবন দন্ডে দন্ডিত হয়।
অবশ্যই আজ আমরা সেই ইতিহাস ভুলতে বসেছি। আমাদের চিন্তা চেতনার নায়ক শাহ্ মুহাম্মদ বদিউল আলম বৃটিশদের সেই লীলাখেলা থেকে মুক্তির জন্য কলমের মাধ্যমে সাড়া জাগিয়েছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি ইংরেজি পত্রিকা দি মোহামেডান অবজারভার পত্রিকায় তাঁর ক্ষুরধার লেখনীতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সেই জন্য পত্রিকা বন্ধ ও সম্পাদক শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলমকে জেলে অন্তরীণ রাখা হয়।
১৪ মহরম, ১ জুন ২০২৩ চট্টগ্রামের কৃতী বীর সন্তান ও মুসলিম মনিষীদের উদ্ভাসীত ডিপুটি শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলমের মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষে শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম প্রণীত আমার পীর (১ম ভাগ) থেকে তাঁর জীবনীর অংশ বিশেষ এ প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ করা হল।
১৮৫৬ সালে ২১শে জুলাই চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জাফর আলী হিল (বর্তমানে ডিসি হিল, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম-এর সরকারি বাসভবন) এর বাংলোয় তৎকালীন সরকারি উকিল ও স্বনামধন্য জমিদার মরহুম জাফর আলী খান সাহেবের এক পৌত্র জন্মগ্রহণ করেন। তিনিই পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ হযরত শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ) ওরফে জোলফুক্কার শাহ্ জাঁহাগীরি প্রকাশ শাহ্ সাহেব।
হযরত শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ) এর পিতা খান বাহাদুর মৌলানা আনওয়ার আলী খান তৎকালীন একমাত্র মুসলিম সাব জজ ও সদর আমিন যার পূণ্যকীর্তি বহন করে আছে চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার কালীপুর গ্রামে অবস্থিত ‘সদর জামে মসজিদ', ‘সদর আমিন হাট' ও ‘সদর আমিন খাল'। তাঁর চাচা মৌলানা মোহাম্মদ করিমদাদ খান ছিলেন বিহার রাজ্যের পাটনা শহরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, যার কাছে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। তিনি চট্টগ্রাম সরকারি স্কুল , যা চট্টগ্রাম কলেজের ঐ জাইগায় ছিল পরে কলেজ স্থাপন হলে তা শরীয়ে বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল আইসফ্যাক্টি রোড ও কলিকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ালেখা করেন পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেজুয়েশন সম্পুর্ণ করেন।
শিক্ষা জীবন শেষে তিনি ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে নোয়াখালীর খাসমহালে যোগদান করেন।(১৮৮৩-১৮৯২) চাকরিকালে কালেক্টর সাহেব এর মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও বৃটিশবিরোধী মনোভাব দেখে তখনকার চট্টগ্রামের কমিশনার মি. লয়েল এর যোগসাজশে তাঁকে চাকুরিচ্যুত করেন। এক বছরকাল তিনি এই অবস্থায় ছিলেন। তিনি কমিশনার ও কালেক্টরের বিরুদ্ধে তদানীন্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাছে এর বিহিত চেয়ে আবেদন করেন। অবশেষে সত্য ও ন্যায়ের জয় হলো। লেফটেন্যান্ট গভর্নরের নির্দেশে তিনি আবার সসম্মানে স্বীয় পদে পুনর্বহাল হলেন।
১৮৯১ ইংরেজি সনের মে মাসের ১৬ তারিখে আমার মোকদ্দমা গভর্নমেন্ট নিত্তি করেন এবং তখনকার লেফটেন্যান্ট গভর্নর সার স্টুওয়ার্ট বেলী এক সুদীর্ঘ রায় প্রকাশ করিয়া তাকে চাকরিতে বহাল করেন। সেই রায় হতে কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করলাম-
"Sir Stuart Bayley regrets that Mr. Lyall in going to express his disapproval of the suggestion made by Government regarding Moulavi Badiul Alam should have betrayed himself into inaccuracies and overstatements pointed out by the Board. Personal explanation is necessary. Under these circumstances Moulavi Badiul Alam is reinstated."
উল্লেখ যে, আজ হতে ৯৭ বছর আগে ১৪ মহরম, ১৩৫০ হিজরী, ইংরেজি ১ জুন ১৯৩১ সালে নিজ গ্রাম বাঁশখালী থানার ইজ্জত নগরের সাহেব বাড়ীতে (কালিপুর) তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে জানাযায়, তিনি মানুষ - মানবতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, দ্বীন, ধর্ম, গ্রন্থ প্রনয়ন ও তরিকায়ে জাঁহাগিরিয়ার পতাকা কে উজ্জল করে দ্বীন ও আখেরাতের শিক্ষায় মানুষকে আলোকিত জীবন দান করেছিলেন সারা পৃথিবী ব্যাপি। তাঁর লিখিত গ্রন্থ হোয়াট ইজ ম্যান (মানুষ ও বিশ্বজনীন ধর্ম) বর্তমানে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ানো হয় ও গবেষণা চলছে। তিনি ঐতিহ্যবাহী সাতকানিয়া মির্জাখীল দরবার শরীফের মহান খলিফা ছিলেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের প্রথম ইংরেজি পত্রিকা দি মোহামেডান অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি বৃটিশ শাসন আমলে সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৯১৪ সালে একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ হোয়াট ইজ ম্যান রচনা করেছেন। বইটির আজ হতে ১০৮ বছর আগে লিখিত এই বই পৃথিবীবাসীর কাছে খুবই মুল্যবান। তার এই বইটি সহ আরো অনেক মূলবান বই পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে এখন।
১লা জুন ১৯৩১ সাল, মোতাবেক ১৪ই মহরম ১৩৫০ হিজরী রোজ সোমবার চট্টগ্রামে ইন্তিকাল করলে একটি কণ্ঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল চিরতরে। তাঁর বাড়ীর সামনে সুনীল দীঘির উত্তর পাড়ে মোগল কারুকার্যের আদলে সবুজ শ্যামলে ঘেরা প্রাকৃতিক অপরুপ সুন্দর পরিবেশে এই মাজার শরীফ অবস্থিত। তারই অব্যান্তরে শুয়ে আছেন জাতীর প্রেরণা হয়ে।যেন এইটা জান্নাতের বাগানে পরিনত হয়েছেএবং জিয়ারতে স্থান রুপে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে জিয়ারতের উদ্দেশ্য। জিয়ারত করে প্রতি নিয়ত ফয়েজ প্রাপ্ত হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা এই অলী আল্লাহর উছিলায় আমাদেরকে তাঁর দেখানো সুপথে চলার তৌফিক দান করুন আমিন।তাঁর ওফাত দিবসে আমার বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম।
সম্পাদক/প্রকাশক : লিটল ম্যাগাজিন চট্টলানামা।
সাধরণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ।