বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন

কবে পাওয়া যাবে একজন ভালো স্ট্রাইকার

কাউসার আলম
  • Update Time : শুক্রবার, ৪ জুন, ২০২১
  • ২৭ Time View

আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশের ম্যাচটা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের প্রতিক্রিয়া কিছুটা মিশ্র। কারও কাছে ১-১ গোলে ড্র হওয়া এই ম্যাচের ফল বাংলাদেশের জন্য জয়ের সমান। কেউ বলছেন, যেভাবে বাংলাদেশ ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে খেলেছে, তাতে না জেতার আক্ষেপটা থেকেই যাচ্ছে। কেউ আবার এই ম্যাচের ফলে খুশি হওয়ার কোনো কারণ দেখছেন না! তবে সবকিছু ছাপিয়ে যে ব্যাপারটি রীতিমতো হাহাকারের মতো শোনাচ্ছে, সেটি হচ্ছে ‘অভাববোধ’। একজন ভালো স্ট্রাইকার থাকলে কে জানে ম্যাচটা হয়তো সত্যি সত্যিই বাংলাদেশ জিতে যেতে পারত।

এই ‘গোল করতে না পারা’ যে বাংলাদেশের ফুটবলের কী ভীষণ সমস্যা, সেটি তো আমরা টের পাচ্ছি ৩৬ বছর ধরেই। ১৯৮৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশের খেলা ৫৬টি ম্যাচের পরিসংখ্যান যদি আমরা দেখি, তাতে চমকে ওঠাটা অস্বাভাবিক না। গতকাল তপু বর্মণের সমতাসূচক গোলটি নিয়ে বাংলাদেশের মোট গোল বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৩৭টি (এর একটি অবশ্য আত্মঘাতী)। ৩৬টি গোল এসেছে ২৪ জনের কাছ থেকে। এদের মধ্যে স্ট্রাইকার বা ফরোয়ার্ডদের কাছ থেকে পাওয়া বাংলাদেশের গোল ২২-২৩টির বেশি নয়। বাকি গোলগুলো করেছেন এমন খেলোয়াড়েরা, যাঁদের কাজ প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো, কিংবা দলের ফরোয়ার্ডদের গোল তৈরি করে দেওয়া। কালও বাংলাদেশ দলের ত্রাণকর্তা হয়ে উঠলেন একজন পুরোদস্তুর ডিফেন্ডার। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দুটি করে গোল করেছেন বাংলাদেশের এমন ফুটবলারদের মধ্যে খাঁটি ডিফেন্ডারের নামগুলো দেখলেই চিরকালীন স্ট্রাইকিং সমস্যাটা ফুটে উঠবে। গোলদাতাদের তালিকায় দুটি করে গোল করেছেন কায়সার হামিদ, জুয়েল রানা, মোহাম্মদ সুজন। এঁরা তিনজফেন্ডার হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবলে বড় তারকা।
স্ট্রাইকারের দায়িত্বটি শেষ পর্যন্ত পালন করলেন ডিফেন্ডার
তপু বর্মণের গোলের একটু আগেই কী দারুণ একটা গোলের সুযোগ মিস করলেন মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। যে জায়গায় তিনি বল পেয়ে গিয়েছিলেন, সেটি যেকোনো ম্যাচে গোলপ্রত্যাশীর জন্য ‘গোল্ডেন স্পট’। কাল নিশ্চিত আবদুল্লাহ নিজেও ভাবতে পারেননি যে তাঁর নেওয়া শটটি আফগান গোলকিপারকে পরাস্ত না করে তাঁর পায়ে লেগে প্রতিহত হবে। টেলিভিশনে যাঁরা খেলা দেখছিলেন, ওই মুহূর্তে নিশ্চিত তাঁরা প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন উল্লাস করার। কিন্তু উল্লাসের বদলে শেষ অবধি তাঁদের দিতে হয়েছে মাথায় হাত।
স্ট্রাইকিং সমস্যা যে কত আক্ষেপ তৈরি করেছে এ দেশের ফুটবলে, তার কোনো হিসাব নেই। বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই। এই সেদিনের কথা। কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে (সল্টলেক স্টেডিয়াম) ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের অ্যাওয়ে ম্যাচটির কথাই মনে করুন। সে ম্যাচে ৮৮ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ড্র করেছিল বাংলাদেশ। সাদউদ্দিনের গোল কলকাতাকে চমকে দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পর অন্তত গোটা তিনেক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেছিলেন বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা। সেগুলো কাজে লাগাতে না পারার কষ্টটা এখনো পোড়ায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের। এই আফগানিস্তানের বিপক্ষেই প্রথম লেগে তাজিকিস্তানের দুশানবেতে ‘গোল মিস’ পয়েন্ট পেতে দেয়নি বাংলাদেশকে। সে ম্যাচে স্ট্রাইকার নাবিব নেওয়াজ জীবনের মিস আক্ষেপ হয়েই আছে। সেই আক্ষেপটা হয়তো গতকাল রাত থেকে আরও পেয়ে বসবে ফুটবলপ্রেমীদের। আফগানিস্তান যে আহামরি কোনো দল নয়, সেটি তো মাঠেই প্রমাণিত। গ্রুপে এমন একটা দল থাকার পরও একটি ম্যাচেও জিততে না পারার মূল কারণটা তো ওই—গোল করতে না পারার সমস্যা।
গোল করতে না পারার হতাশা আছে ২০১৯ সালের অক্টোবরে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন ও ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক শক্তিশালী কাতারের বিপক্ষেও। বৃষ্টিভেজা সে দিনটি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠে কী অসাধারণ ফুটবলই না খেলেছিলেন জামাল ভূঁইয়া-সাদউদ্দিন-ইব্রাহিমরা। নাগালের বাইরে থাকা কাতারকে এক প্রকার চেপেই ধরা হয়েছিল সেদিন। কিন্তু ওই ম্যাচেও গোটা তিনেক এমন সুযোগ মিস হয়েছে, যা যেকোনো আন্তর্জাতিক দলের স্ট্রাইকার গোল করবেন। শুরুতেই ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর নাবিব নেওয়াজ, জামাল ভূঁইয়া গোল মিস করেছিলেন। একটা বার ভেবে দেখুন তো, ওই ম্যাচে জামাল-জীবন যদি গোল পেয়ে যেতেন তাহলে…! বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রতিপক্ষকে এমনভাবে হারানোর সুযোগ অতীতে আর কখনো বাংলাদেশ পেয়েছে কি না, সন্দেহ। যে ম্যাচগুলোর কথা বলা হলো, একটু সাহস করে বলে ফেলাই যায়, তিনটি ম্যাচেই জিততে পারত বাংলাদেশ। অন্তত ঢাকায় কাতার আর কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে দুটি ম্যাচে তো বটেই।
বাংলাদেশেরই এক সাবেক স্ট্রাইকার ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব একবার বলেছিলেন, ‘স্ট্রাইকার তৈরি করা যায় না। গোল করার মতো খেলোয়াড় আবির্ভূত হয়।’ সালাম মুর্শেদী, আশরাফউদ্দিন চুন্নু, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, ইমতিয়াজ আহমেদ নকীবের পর আলফাজ আহমেদ, রোকনুজ্জামান কাঞ্চন কিংবা জাহিদ হাসান এমিলি। খুব বেশি স্ট্রাইকারের আবির্ভাব এ দেশে হয়নি। কেন হয়নি, সেটি একটা বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে বেড়াচ্ছি আমরা। আর কত দিন খুঁজতে হবে, সেটি কারোরই জানা নেই।
মতিন মিয়া আতংক ছড়িয়েছেন আফগান সীমানায়। তাঁকে গোল করার দায়িত্বও নিতে হবে।
কিছুদিন আগে নাইজেরীয় ফুটবলার এলিটা কিংসলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলের সুপরিচিত মুখ এই দীর্ঘদেহী নাইজেরীয় ফুটবলার বাংলাদেশ দলের জার্সিতে খেলার স্বপ্ন দেখেন। তাঁকে কবে নেওয়া হবে, আদৌ তাঁকে নেওয়া হবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নেই ফুটবলপ্রেমীদের। তবে স্ট্রাইকার সংকটের দেশে এলিটা যে একপশলা শীতল বৃষ্টির পরশ, সেটি বলাই যায়। এলিটাদের মতো খেলোয়াড়দের দলে নেওয়ার পাশাপাশি স্ট্রাইকার খোঁজাটা বন্ধ করা যাবে না। গোলের রাস্তা কিছুটা হলেও চেনেন, ঘরোয়া ফুটবলে এমন খেলোয়াড়দের ‘গোলচর্চা’র সুযোগটা তৈরি করে দিতেই হবে। এ জন্য ক্লাবগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জার্সিতে তারিক কাজীর মতো ফুটবলারের আবির্ভাব হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্য তিনি গোলের রাস্তা বন্ধ করাতেই বেশি পারদর্শী। ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষায় এমন একজনের, যিনি গোল করতে পারেন। এমন কাউকে পাওয়া না গেলে ড্র করেই জয়ের আনন্দ খুঁজতে হবে। কিন্তু এভাবে আর কত দিন!

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021 Janatarnissash
Theme Dwonload From