বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

শ্রমের কষ্ট, জীবনের আক্ষেপ, আশকোনায় শ্রমিকদের মুখে না-পাওয়া স্বস্তির গল্প

মতিন সাগর
  • প্রকাশ সময়ঃ রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও জীবনে স্বস্তি মেলে না- এমন অভিযোগ দক্ষিণখান, আশকোনা বসবাসকারী দিনমজুর ও রাজমিস্ত্রির হেল্পারদের। প্রতিদিন ভোরে কাজের খোঁজে বের হওয়া এ মানুষগুলো সন্ধ্যায় ঘরে ফেরেন কেবল তিনবেলা ভাত জোটানোর নিশ্চয়তা নিয়ে। কিন্তু জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, চিকিৎসা, সন্তানের ভালো শিক্ষা কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা- এসব যেন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

রাজমিস্ত্রির হেল্পার বাবুল মিয়া (৪৫) কাজের ফাঁকে আক্ষেপ করে বলেন, পরিশ্রম করলে নাকি ভাগ্যের চাকা ঘোরে। ছোটবেলা থেকে পরিশ্রম করছি। কিন্তু পরিশ্রমের বিনিময়ে পেলাম কি? শুধু তিন বেলা ভাত। জীবনে কোনো পরিবর্তন এল না। বিদেশে একই শ্রম দিলে ভালো টাকা পাওয়া যায়। দেশে সেই শ্রমের মূল্য নেই।

বাবুল মিয়ার মতোই একই অভিমত জানালেন তাঁর সহকর্মী পারভেজ ও এরশাদ। তাঁদের দাবি, দেশের শ্রমিকদের জীবনের উন্নতি একমাত্র তখনই সম্ভব হবে যখন শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হবে। পারভেজ বলেন- শ্রমিকদের কাজ ছাড়া সমাজের অবকাঠামো উন্নয়ন হয় না। অথচ আমাদেরই জীবন সবচেয়ে অনিশ্চিত। আমাদের মজুরি না বাড়লে ভাগ্যও বদলাবে না।

এই শ্রমিকদের অসহায়ত্ব ও আক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেভেলপার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার মো. মাসুদুল হাসান টিটু বলেন- বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা শ্রমিকদের যে মজুরি দিই সেটা তাদের পরিবারের সঠিক জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয়। শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়। সরকারের উদ্যোগ ছাড়া শ্রমিকদের কষ্ট লাঘব করা যাবে না।

বর্তমানে রাজধানীর আশকোনা ও আশপাশের এলাকায় রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিকদের দিনমজুরি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিতে সেই আয় দিয়ে পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারদর বাড়ছে প্রতিনিয়ত, অথচ শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে না সেই হারে। ফলে দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের জীবনে স্থায়ী কোনো উন্নতির ছাপ পড়ছে না।

এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন এ সব শ্রমিকরা। অথচ তাঁদের জীবন-মান উন্নয়নে যথেষ্ট কার্যকর উদ্যোগ নেই। বিদেশে একই ধরনের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয়, কিন্তু দেশে এ শ্রমিকরা বঞ্চিত হন মৌলিক অধিকার থেকেও।

অবকাঠামো, আবাসন ও শিল্প কারখানার উন্নয়নের পেছনে যারা দিন-রাত শ্রম দিচ্ছেন, তাদের জীবনযাত্রা উন্নত না হলে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হলে শুধু শ্রমজীবী মানুষের জীবন-মানই উন্নত হবে না, দেশের অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।

অভিযোগ, আক্ষেপ আর অনিশ্চয়তার বেড়াজালে বন্দি এ শ্রমিকরা প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখেন সুন্দর জীবনের। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে হলে শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন ও সরকারি উদ্যোগই হতে পারে একমাত্র ভরসা।

দয়া করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর