বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে বাংলাদেশে হয়তো বায়োপিক বানানো হবে কখনও। সেই বায়োপিকে ফাতেমা বেগমের ঠাঁই হবে কিনা জানিনা। আমার সামর্থ্য থাকলে শুধু ফাতেমা বেগমকে নিয়ে একটা সিনেমা বানাতাম। মানুষকে তার গল্পটা বলতাম। কীভাবে ভোলা থেকে আসা এক নিম্নবিত্ত তরুণী, স্বামীহারা এক নারী হয়ে উঠেছিলেন দেশের সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বস্ত সহচর।
বেগম জিয়ার একটা ছবি আছে, ২০১৪ সালের একপাক্ষিক নির্বাচনের আগে বিএনপির ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি চলছে। তখন প্রশাসনের তরফ থেকে বালুর ট্রাক দিয়ে উনার গুলশানের বাসার সামনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলো। পল্টনে জনসভায় যাওয়ার জন্য বেগম জিয়া বাসা থেকে বের হবেন, কিন্তু উনাকে বাসা থেকেই বের হতে দেবে না পুলিশ। তখন বেগম জিয়ার সঙ্গে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাসার গেটে কয়েক দফা ধস্তাধস্তি হয় পুলিশের, খালেদা জিয়া সেই পরিস্থিতিতেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তখন তার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছিলেন ফাতেমা বেগম। ধাক্কাধাক্কির মধ্যে তার পুরো মনোযোগ ছিল খালেদা জিয়ার দিকে, তার ম্যাডামের গায়ে যেন কোন আঁচড় না লাগে।
ওই পাঁচ-দশ মিনিটের সময়টা আসলে ফাতেমার সারা জীবনের গল্প বলে দেয়। ২০০৯ সাল থেকে খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন ফাতেমা। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানের এই জননী ঢাকায় এসেছিলেন কাজের খোঁজে, ঠাঁই হয়েছিল বিএনপি চেয়ারপার্সন এবং তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাসায়। সেই থেকে শুরু করে এবছরের নভেম্বরে খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত গত ষোলো বছর ধরে তিনি ছিলেন বেগম জিয়ার ছায়াসঙ্গী।
তিনি যখন সুস্থ ছিলেন, তখন ফাতেমা ছিলেন তার পাশে। বেগম জিয়া যখন জেলখানায় গিয়েছেন, তখনও তিনি তার সঙ্গে ছিলেন। এমনকি প্যান্ডেমিকের সময় খালেদা জিয়া যখন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তখনও ফাতেমা উনাকে ছেড়ে যাননি, একমনে সেবা করে গেছেন। আবার এবছর খালেদা জিয়া যখন লন্ডনে চিকিৎসার জন্য গেছেন, ফাতেমা তখনও ছিলেন উনার পাশে। খালেদা জিয়ার জন্য তিনি মুক্ত আকাশ ছেড়ে চার দেয়ালের ভেতর স্বেচ্ছা কারাবরণকে বেছে নিয়েছিলেন। এই ত্যাগটাকে আপনি বেতন বা টাকার অঙ্ক দিয়ে মাপতে পারবেন না কোনোভাবেই।

আজকে তারেক রহমান উনার মাকে হারিয়েছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তার সবচেয়ে বড় নেতাকে হারিয়েছে, দেশের মানুষ হারিয়েছে আপোষহীন এক নেত্রীকে। ফাতেমা বেগম কী হারিয়েছেন? সেই খোঁজটা কেউ হয়তো রাখবে না আজ কাল কিংবা কোনোদিনই। ফাতেমা নিজেও হয়তো উনার শূন্যতার কথা বলতে যাবেন না কাউকে। কারণ ফাতেমা বেগমরা স্বজন হারানোর বেদনাকে বিক্রি করতে পারেন না। তাদের বেদনা ভীষণ ব্যক্তিগত।
গত ষোলো-সতেরো বছরে খালেদা জিয়া অনেক দুঃসময় পাড়ি দিয়েছেন, জিয়া পরিবারও খুব খারাপ সময় পার করেছে। ফাতেমা বেগমের মতো মানুষেরা সেই দুঃসময়ে লয়্যালিটির সর্বোচ্চ প্রমাণ দিয়েছেন। আমি জানি, ইতিহাস এই মানুষগুলোকে মনে রাখবে না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তারা শত শত কোটি টাকার মালিক হবেন না। তাই তাদের গল্পগুলো জানা জরুরী। ফাতেমা বেগমদের গল্পগুলো বলাও এজন্য জরুরী…
ফাতেমা বেগমের শিশুবেলাও জানতে চাই আমি।
শ্রদ্ধেয় বেগম খালেদা জিয়াকে দেখার স্পর্শ করার খুব ইচ্ছে ছিলো আমার।সেটা অসম্ভব এখন।বেগম জিয়াকে স্পর্শ করতে না পারলেও আমি আপনাকে একবার ছুয়ে ছেনে দেখতে চাই। বুকে জড়িয়ে নিতে চাই।আপনার স্পর্শে শরীরের গন্ধে বেগম জিয়াকে খুঁজে নিতে চাই।
ভালো থাকুন আপনি ফাতেমা বেগম।
আপনি আমার কাছে একটা বিদ্যালয়ের মতো।আপনার কাছ থেকে আমি শিখলাম -কেমন করে কারো জীবনের জন্য জীবন হয়ে উঠা যায় শূন্যে থেকেও।অবিশ্বাসের দীর্ঘ মিছিলেও কিভাবে বিশ্বাসের আস্ত এক ক্যাসেল হয়ে উঠা যায় সেটাও শিখলাম আপনারই কাছ থেকে।
শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানবেন –
-অধরা জাহান
সূত্রঃ অধরা জাহানা এর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত।