বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৫১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
‘হাবিবি’ নিয়ে আসছেন নুসরাত ফারিয়া “এসো নিজেকে নিজে চিনি” পরিবার আয়োজিত বাউল গানের প্রতিযোগিতার গ্রান্ড ফিনালে ২০ অক্টোবর শুধুমাত্র অনুদানের সিনেমা দিয়েই মুখর সিনেপাড়া বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ ও স্কটল্যান্ডের সম্ভাব্য একাদশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দেখা যাবে যেসব চ্যানেলে ‘বাংলাদেশকে আমরা পাপুয়া নিউগিনির চেয়ে ওপরে দেখি না’: স্কটল্যান্ড কোচ শেন বার্জার টি ২০ বিশ্বকাপ ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আজ শুরু ইভ্যালির ওয়েবসাইট-অ্যাপ বন্ধের ঘোষণা কুমিল্লার ঘটনার পেছনের কারণ খোঁজা হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ‘দেশ বিক্রি করে তো আমি ক্ষমতায় আসব না’ এটাই বাস্তব

আজ অমর নায়ক সালমান শাহ’র মৃত্যু বার্ষিকী

ফরিদুল আলম ফরিদ
  • প্রকাশ সময়ঃ সোমবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ১২৮ বার পড়া হয়েছে

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। যথারীতি বিটিভিতে শুক্রবারের পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি চলছিল। ঠিক বিকেল ৪টার খবরে সংবাদ পাঠিকা খবরের শুরুতেই জানালো ‘একটি শোক সংবাদ।’ শোক সংবাদটি ছিল অমর নায়ক সালমান শাহ-র। তাঁর অকাল মৃত্যুর খবরটি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন গ্রামে, শহরে বহু মানুষ রাস্তায় বের হয়েছিল। সেই শোক দিন দিন বেড়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের দিনে অনেক বেড়েছে কিন্তু সালমান শাহ-র জন্য শোক কমেনি। ভালোবাসা যেমন বেড়েছে শোকও বেড়েছে। ভালোবাসাটা তাঁর রেখে যাওয়া কাজের জন্য আর শোক তাঁর অসময়ে চলে যাওয়ার জন্য।

‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ গানে গানে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-তে জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেত যে সালমান শাহ-কে এনেছিলেন দর্শকের সামনে তাঁর নামটা পরে ইতিহাস হয়েছিল বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনে। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে অনেকের থেকে অনেকগুণ এগিয়ে ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন বা সালমান শাহ।

চলচ্চিত্র
১৯৯৩ – কেয়ামত থেকে কেয়ামত
১৯৯৪ – তুমি আমার, অন্তরে অন্তরে, রঙিন সুজন সখি, বিক্ষোভ, স্নেহ, প্রেমযুদ্ধ
১৯৯৫ – দেন মোহর, কন্যাদান, স্বপ্নের ঠিকানা, আঞ্জুমান, মহামিলন, আশা ভালোবাসা
১৯৯৬ – বিচার হবে, এই ঘর এই সংসার, প্রিয়জন, তোমাকে চাই, স্বপ্নের পৃথিবী, সত্যের মৃত্যু নেই, জীবন সংসার, মায়ের অধিকার, চাওয়া থেকে পাওয়া
১৯৯৭ – প্রেম পিয়াসী, স্বপ্নের নায়ক, শুধু তুমি, আনন্দ অশ্রু, বুকের ভিতর আগুন

নাটক
১৯৮৮ -সৈকতে সারস
১৯৯৩ – পাথর সময়, ইতিকথা
১৯৯৪ – আকাশছোঁয়া, দোয়েল
১৯৯৫ – সব পাখি ঘরে ফেরে, নয়ন
১৯৯৬ – স্বপ্নের পৃথিবী

অসমাপ্ত ছবি (চুক্তিবদ্ধ, মহরত ও শ্যুটিং শেষ হয়নি)
শেষ ঠিকানা
কে অপরাধী
অধিকার চাই
রঙিন নয়নমনি
মধুর মিলন
তুমি শুধু তুমি
মন মানে না
ঋণশোধ
প্রেমের বাজি
প্রেমসন্ধি

শিশুশিল্পী
শিশুশিল্পী হসেবে আলমগীর কবির পরিচালিত ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ ছবিতে অভিনয় করেছিল সালমান। এ ছবির রইচ চরিত্রের ছোটবেলার ভূমিকায় ছিল সালমান। কাজটি শেষ হয়নি। পরে ছবিটি ১৯৯৭ সালে আবারও নির্মাণ করেন পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। তখন রইচের ভূমিকায় অন্য একজন ছিল।

সবচেয়ে বেশি ছবির নায়িকা শাবনূর, ১৪টি। মৌসুমীর সাথে ৪টি। শাবনাজের সাথে ৩টি। লিমার সাথে ২টি।

চলচ্চিত্রের সালমান শাহ-কে বাণিজ্যিক ছবির অলরাউন্ডার পারফর্মার হিসেবে দেখা গেছে। তাঁর রোমান্টিক, রোমান্টিক ড্রামা, ফ্যামিলি ড্রামা, পলেটিক্যাল ড্রামা, ট্র্যাজেডি, কমেডি সব ধরনের জনারের ছবি আছে। আপনি তাকে বাণিজ্যিক ছবির এনজয়অ্যাবল নাচ, গান, ফাইট, ড্রামা সব মিলিয়ে চাইলে ‘আঞ্জুমান’ দেখতে পারবেন। আগাগোড়া রোমান্টিক নায়কের মধ্যে চাইলে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত, তোমাকে চাই, অন্তরে অন্তরে, জীবন সংসার, তুমি আমার, মহামিলন, স্বপ্নের ঠিকানা’ দেখতে পারেন। ফ্যামিলি ড্রামাতে একইসাথে পাবেন ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত, দেন মোহর, স্নেহ, অন্তরে অন্তরে, জীবন সংসার, মায়ের অধিকার’-এ। পলেটিক্যাল ড্রামাতে ‘বিক্ষোভ, স্বপ্নের পৃথিবী’ আদর্শ ছবি। কমেডিতে ‘আশা ভালোবাসা’ চমৎকার। ট্র্যাজেডিতে ‘আনন্দ অশ্রু, স্বপ্নের নায়ক’ অসাধারণ। মাস্টারপিস কমার্শিয়াল ছবিতে সালমানের ‘আনন্দ অশ্রু, সত্যের মৃত্যু নেই, বিক্ষোভ, এই ঘর এই সংসার’ এ ছবিগুলো যে কোনো সময়ের জন্য আদর্শ।
গ্রাম-শহর দুই প্রেক্ষাপটে যে নায়ক নিজের পারফরম্যান্স দেখাতে পারে সেই ফুল প্যাকেজ নায়ক। সালমানের একই ছবিতে সেই আবহ আছে। যেমন – বিচার হবে। এই ছবির প্রথমদিকে আছে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সহজ-সরল যুবক সালমানের অসাধারণ পারফরম্যান্স অন্যদিকে মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত আছে শহুরে দাপুটে মাস্তানের অভিনয়। এছাড়া ‘রঙিন সুজন সখি’ ছবির গ্রামীণ সুজন তো আছেই। এ ছবির সুজন চরিত্রে ‘কথায় বলে গাছের ব্যাল পাকিলে তাতে কাকের কি’ গানে সালমানের অভিনয় যে কোনো গ্রামীণ চরিত্রে অভিনয় করা নায়ককে হার মানায়।

নানার সাথে কিশোর বযসে সালমান শাহকমপ্লিট প্যাকেজের একজন কমার্শিয়াল হিরোর দিক থেকে সালমান শাহ অনেক ফ্যাক্টরেই অনবদ্য :
সুদর্শন – সালমান শাহ ছিল সুদর্শন। দেখলেই নায়ক মনে হত।
সুঅভিনেতা – তাঁর অভিনয়দক্ষতা ঈর্ষণীয়। চরিত্রকে পোট্রেট করাই ছিল পর্দায় তাঁর স্বাভাবিক কাজ।
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন – সালমান লুকের দিক থেকে ছিল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। যে কোনো চরিত্রে তাঁর সহজাত ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেত।
বেসিক স্মার্টনেস ও ফ্যাশন – তাঁর বেসিক স্মার্টনেস ছিল। নিজস্ব পছন্দের শার্ট, প্যান্ট, ব্যান্ডেনা, ঘড়ি, ক্যাপ, আলখাল্লা, সানগ্লাস ইত্যাদি ছিল। তাঁকে ফ্যাশন আইকন বলা হয় এজন্যই।
প্রজন্মজয়ী – নিজের প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় ও আইডল ছিল সালমান। নিজের প্রজন্মকে ছাপিয়ে পরবর্তীকালে অন্য প্রজন্মেরও মন জয় করেছে তাঁর রেখে যাওয়া কাজের মাধ্যমে। কমপ্লিট হিরো এবং হিরোইজম ছিল তাঁর মধ্যে।

সালমান তাঁর সময়ের একমাত্র তারকা যে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন প্রোডাকশনেও কাজ করেছে এবং দুই মাধ্যমেই সফল। তাঁর নাটকের মধ্যেও হিরোইজম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ‘নয়ন, স্বপ্নের পৃথিবী’-তে। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা, সচেতনতা তৈরি করতেও ভূমিকা রেখেছিল তাঁর নাটক। ‘ইতিকথা’ নাটকের ‘বজ্রযোগিনী গ্রামে এলো নতুন দিশা’ গানটির মাধ্যমে গ্রামীণ বিপ্লবের একটা হাতছানি মিলবে। ক্যারিয়ারের প্রথমদিকেই অসাধারণ বক্তব্যধর্মী কাজ তাঁর ছিল ভাবতেই অবাক লাগে। নাটকেও তাঁর ফ্যাশনেবল উপস্থিতি ছিল। অনেকে বলে আর্ট ফিল্ম জাতীয় অভিনয় কি সালমান পারত! তাদের অবগতির জন্য জানাতে হয় সালমানের নাটকের যে অভিনয় বিশেষ করে ‘ইতিকথা’ নাটকে ছিল এই অভিনয়টা আর্ট ফিল্ম বা ক্যারেক্টারকে শান্ত, সুন্দর করে তুলে ধরার রসদ ছিল। এমনকি ‘এই ঘর এই সংসার’ ছবির কিছু সিকোয়েন্সে সেরকম ইলিমেন্ট আছে।

মিউজিক্যাল ছবির গুণ সালমানের ছবিগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ২৭টি ছবির কোনো না কোনো গান জনপ্রিয়। এর মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় গানের অভাব নেই। গানের দিক থেকে সালমান পুরো বাংলাদেশী চলচ্চিত্রেই যে কোনো নায়কের সাথে অনায়াসে প্রতিযোগী হয়ে যায়।

এই সালমান শাহ যখন তাঁর তিন বছরের ক্যারিয়ারে ঢালিউডের সবচেয়ে ক্ষণজন্মা নায়ক/অভিনেতা হয়ে নিজস্ব কীর্তি গড়েছিল তাঁকে আমরা অকালে হারাই ১৯৯৬ সালে। তাঁর মৃত্যু রহস্য নিয়ে সেই ১৯৯৬ থেকে আজ পর্যন্ত বিচারের দাবিতে দর্শকভক্ত, পরিবার দুদিক থেকেই আন্দোলন চলছে। প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা ছিল পরে পরিবারের মাধ্যমে আপিল বিভাগে আবেদনের পর উপযুক্ত সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যা মামলা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় সেই ১৯৯৬ সাল থেকেই সালমানহত্যার বিভিন্ন প্রমাণ সংবাদপত্র ও বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে থাকার পরেও বিচার হয়নি। বিচার আমরা আমাদের জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বাস্তবতা দেখলে আজকের সারাংশে বলতে হয় সালমান শাহ নামের নক্ষত্রটি আসলে ভুল ইন্ডাস্ট্রিতে জন্ম নিয়েছিল। যার মাধ্যমে ঢালিউড সম্পূর্ণ আলাদা একজন তারকাকে পেয়েছে ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে গর্ব করার জন্য সেই ইন্ডাস্ট্রি তাকেই ধরে রাখতে পারেনি অথচ দায়িত্বটা তাদেরই ছিল বেশি। অন্য কোনো ইন্ডাস্ট্রি হলে তাঁকে পরম যত্নে আগলে রাখত। দুর্ভাগ্য এ স্বার্থপর ইন্ডাস্ট্রির যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রই হয়েছে। নিষিদ্ধ পর্যন্ত করেছিল নোংরা ফিল্ম পলিটিক্সে। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দেয়নি।

সালমান শাহ একাই একটা ইতিহাস। নামে, কর্মে। তাঁর মতো আর কেউ নেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সব উজ্জ্বল তারকাকে সম্মান প্রদর্শনের পরেও সালমানের জন্য একদম আলাদা একটা জায়গা ফাঁকা রাখতে হয় কারণ সে সবার থেকে আলাদা। তাঁর পূর্ণতা ও শূন্যতার দিকে তাকালে চোখটা পোড়ায় ভীষণ। একটা ঘটনাই ঘটে তা হলো চোখজোড়া ছলছল করে।

দয়া করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
© All rights reserved © 2021 Janatarnissash
Theme Dwonload From