শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন

প্রকৃত বন্ধু চিনে যুক্তিযুক্ত সম্পর্ক দোষের নয়

নজরুল ইসলাম তোফা
  • আপডেট সময়ঃ মঙ্গলবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৭৩ বার পঠিত

মানুষে মানুষে খুব পাস্পরিক সুসম্পর্কের মাধ্যমে তৈরি হয় বন্ধুত্ব। বিনা কারণে যেমন বন্ধুত্বের জন্যেই বন্ধুত্ব হয়, আবার প্রয়োজনেও বন্ধুত্বের পরিধি খুব বাড়ে। সে প্রয়োজন শুধু আর্থিক ও বৈষয়িক হবে এমন কোনো কথা নেই। বন্ধুত্ব হওয়ার মাঝে যা যা প্রয়োজন তার মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে চিন্তা-চেতনা কিংবা রুচির মিল। সমমনা দুজন মানুষের একটি জগৎ থেকেই তো শুরু হয় বন্ধুত্ব। আসলেই বন্ধুত্ব ছাড়া ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সমাজ কার্যত কোনোটাই তেমন চলতে পারে না। খুব ভালো বন্ধু পরিবার, সমাজ ও চারপাশের মনোসামাজিক উন্নয়নের জন্যে দরকার আছে। আবার ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব মানেই প্রেম, অসম বয়স হলে চোখ কপালে তোলে প্রেমের নামে অহেতুক বন্ধুত্ব করা উচিত না। ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়ালে বা ভালো উপহার দিলে যে ভালো বন্ধু হওয়া যায় না, সেটাও বুঝতে হবে। সুন্দর এবং উন্নত সমাজ বিনির্মাণে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্কে গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই,- বন্ধুত্বের গুরুত্ব যেমন বেশি তেমনি বন্ধুত্ব বা সুসম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব তারচেয়ে বেশি। সত্যিকারের বন্ধুত্ব মানে ‘আজীবন বন্ধুত্ব’। এ ধারণাটিও সবসময় ঠিক নাও হতে পারে। ছোটবেলা যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে, শিক্ষা জীবনে যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, কর্ম জীবনে প্রবেশ করার পর তার অধিকাংশই হারিয়ে যায়। আবার বাসস্থান পরিবর্তনের কারণেও পুরানো বন্ধুর জায়গাতে নতুন বন্ধুর সৃষ্টি হয়। কর্মজীবী মহিলাদের বেলায় এমন ব্যাপারটি আরও আস্পষ্ট। কর্ম জীবনে ও শিক্ষা জীবনে অনেকের সাথে তাদের বন্ধুত্ব হয়। তারা কর্ম এবং শিক্ষা জীবন ত্যাগ করেই পুরোপুরি গৃহিণী হয়ে গেলে বন্ধুত্বের আওতাটা পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে। তবে এ ধরনের খণ্ডকালীন বন্ধুত্বকেও কম গুরুত্ব পূর্ণ মনে করার কোন প্রয়োজন নেই। জীবনের নানা সময়ে নানা কালে বিভিন্ন মানুষের সাথে প্রয়োজনীয় ও আনন্দদায়ক বন্ধুত্ব হতেই পারে। তাকে যথাযত মুল্যায়নের দৃষ্টিতেই দেখা দরকার বলেই মনে করি। তাদের সংসার জীবনের স্বামী-স্ত্রীর যে সু সম্পর্ক তা বন্ধুত্বের কাতারে চলে আসে। তাঁদের মধ্যে মতামতের মিলেই বন্ধুত্ব হয়। এরফলেই বিবাহবিচ্ছেদও কমে যায়। আবার শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে বন্ধুত্ব সম্পর্কটা

থাকলে তা শেখার প্রক্রিয়াকেও সাবলীল করে। বন্ধুত্বটা মানেই তো একে অপরের মনের মিল থাকা। একজনের সঙ্গে অন্যজনের আগ্রহ ও চিন্তার মিল থাকবে। সুতরাং, সুখ-দুঃখ বা বিপদ-আপদে একেঅন্যের পাশেই থাকার চেষ্টাটাই বন্ধুত্ব।

বন্ধুত্ব মানে হলো যে একে অন্যের সুখে-খুশিতে লাফিয়ে ওঠা একেঅন্যের দুঃখে পাশেও দাঁড়ানো। মন খুলে কথা বলা, হেসে গড়াগড়ি খাওয়া আর চূড়ান্ত ভাবে পাগলামি করার একমাত্র আধার বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব কোনো বয়স মেনে হয় না, ছোটবড় সবাই বন্ধু হতে পারে। বন্ধুত্বের মধ্যে যে জিনিসটা থাকা দরকার তা হলো, সু-গভীর ভালোবাসা। একজন বন্ধুর আত্মার সঙ্গে অন্য বন্ধুর আত্মার টানটাই বন্ধুত্ব। পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বের মধ্যে ‘আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরতা’ বেশি থাকে। তাই বলে, নতুন বন্ধু হতে হলে, তাকে ১০/১২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে—বন্ধুত্বের দাবির জন্যে, এমনটাও ঠিক নয়। তরুনদের জীবনে খুবই খারাপ সময় বা হতাশার মুহূর্তে বড়দের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেই তাদের নতুন জীবনের সূচনা করে দিতে হবে। এসবই তো সঠিক বন্ধুত্বের মধ্যে পড়ে‌। ছোটরা বয়সে বড় যে কোনো মানুষদেকে নিজের গোপন কষ্টের কথা জানানোটা দোষের কিছু না, তা তো বন্ধুত্বের মধ্যেই গন্য হয়‌। বিজ্ঞজন এবং বড়রা ছোটদের জীবন পরিচালনার আস্থা তৈরি করে দেয়া খুবই গুরুত্ব পূর্ণ বন্ধুত্ব‌। আসলেই সঠিক বন্ধুত্বের তালিকায় ‘নারী না পুরুষ’ কিংবা ‘ছোট নাকি বড়’, সেইটা মুখ্য হয়ে ওঠে না।আবেগ, সমস্যা ও আনন্দ-অনুভূতি এবং উপলব্ধিগুলো বন্ধুর কাছে শেয়ার করা উচিত। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় থাকা দোষের নয়। স্হায়ী বন্ধুদের সঙ্গেই আড্ডা দেওয়া উত্তম। স্থায়ী বন্ধুদের বেশ কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকে। যেমন ধরা যাক: নিজস্ব যোগ্যতা, আস্থা, সততা,
সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সমবেদনা,পারস্পরিক, অনুভূতি প্রকাশ, একে অপরের সঙ্গ, স্নেহ, বোঝাপড়া সহ প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত থাকে। একটু অন্য ভাবেই বলার চেষ্টা করি, তা হলো,- “নির্বোধ এবং বোকা মানুষদের বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকো। কারণ তিনি উপকার করতে চাইলেও তার দ্বারা আপনার ক্ষতি হয়ে যাবে।’’ এমন কথাটা- হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন। আবারও হজরত ইমাম জাফর আস-সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছিলেন ‘পাঁচ ব্যক্তির সাথেই বন্ধুত্ব করা সমীচীন নয়। তারা হলো মিথ্যাবাদী, নির্বোধ, ভীরু,পাপাচারী ও কৃপণ ব্যক্তি।’

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সবাইকে পারস্পরিক সুসম্পর্ক তৈরি করে যেন একে অপরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পরকালের সুন্দর জীবন লাভে বন্ধুত্ব কিংবা পাস্পরিক সুসম্পর্ক তৈরি করায় আত্মাতে শক্তিশালী বন্ধন সৃষ্টি করে। উচ্চ শিক্ষাতে সমাজ বিদ্যা, সামাজিক মনো বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব ও দর্শনে বন্ধুত্বের শিক্ষা দেয়া হয় । ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ডেটাবেজ গবেষণায় দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণেই ‘মানুষ সুখী’ হয়। আল্লাহ বলেছেন,‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ‘ভাল কথার শিক্ষা’ দেয় ও মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে জাকাতও দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবনটা পরিচালিত করে। এদেরই উপরেই আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী। (সুরা তাওবা: আয়াত ৭১)। ‘বন্ধু’ শব্দের মাঝেই সব লুকায়িত আছে। এতে কোনো বয়সটা বাধা নয়। কিশোর বয়সের কোন ছেলে এবং মেয়ের সঙ্গে যদি তারচেয়ে বড় কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়, তবে তাদের অবশ্যই জ্ঞানের পরিসীমা বাড়তে বিরাট ভূমিকা রাখে। বাবা- মায়েরাও সন্তানদের ভালো বন্ধু হতে পারে। ভালো মন্দ সব কিছু খোলামেলা আলোচনা করে সন্তানদেরকে গড়ে তুলবে হবে। তারাই আগামী দিনের আলোকিত সুন্দর বা সুখের মানুষ পিতা মাতার কাছ থেকেই যেন হয়। বন্ধুর সঙ্গে অকপটেই সব ভালোমন্দ কথার সহিত মন্দ যত খারাপ হোক র্নিদ্বিধায় বলতে পারাটার নামই প্রকৃত বন্ধু।

✍️লেখক: নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

নিউজটি সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

Find Us

Address
123 Main Street
New York, NY 10001

Hours
Monday–Friday: 9:00AM–5:00PM
Saturday & Sunday: 11:00AM–3:00PM

© All rights reserved © Janatarnissash 2021

কারিগরি সহযোগিতায়: Freelancer Zone
11223