শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০:৪৪ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
প্রসঙ্গ শুভ্র দেবের একুশে পদকঃ ফরিদুল আলম ফরিদ শেখ কামাল হোসেন এর কথা ও সুরে, চম্পা বণিক এর গাওয়া ‘একুশ মানে’ শিরোনামের গানটি আজ রিলিজ হলো নোয়াখালীতে প্রসূতিসহ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সাংবাদিকের মামলা, তদন্তে পিবিআই ‘দম’ সিনেমা নিয়ে ফিরছেন পরিচালক রেদওয়ান রনি চলচ্চিত্র শিল্প সংশ্লিষ্টদের সংগঠন বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাবের নির্বাচনে জয়ী হলেন যারা বাঘায় নাট্য পরিচালক শিমুল সরকারের উপর আবারও সন্ত্রাসী হামলা নাট্যকার পরিচালক শিমুল সরকারের উপর আবারও হামলা বিএনপির দেউলিয়াত্ব রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশীদের জীবন নিয়ে ইউএস লোকেশনে নির্মিত “গ্রীন কার্ড” শীঘ্রই আসছে

শহীদ শাফী ইমাম রুমী’র কাছে লেখা তির্থক আহসান রুবেল এর খোলা চিঠি

তির্থক আহসান রুবেল
  • প্রকাশ সময়ঃ বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৩
  • ১০৬ বার পড়া হয়েছে
প্রিয় রুমি,
কেমন আছো বন্ধু? নিশ্চয় অনেক অনেক ভালো তাইনা? তুমি যেখানে আছো, সেখানে বুঝি সবাই ভালোই থাকে। ভালো থাকবেই না কেন? আমাদের সকল কে ভালো রাখবার জন্যই যে তুমি, স্বাধীনতার তরে প্রাণ বিলিয়ে চলে গেছো লোকান্তরে। চির ভালো থাকার বন্দরে।
অবাক হলে খুব? ভাবছ এই আমি আবার কে? তেমন কেউই নই, তোমার মত আমাকে ষোলকোটি মানুষ বুকে আগলে রাখবে না কেউ, আমার কথা শুনে কোন রোমাঞ্চ প্রিয় যুবকের মনে দেশের তরে প্রাণ সঁপে দেওয়ার দামামা বাজবে না। শিহরিত হবে না কোন কিশোর। আর নাম, না জানলেই বা ক্ষতি কী বল? তোমারই সমবয়েসী আমি। যে বয়সে তুমি দেশের তরে প্রাণ দিয়েছ,আজ সেই বয়সে বসে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বুক কাঁপে এমনই এক কাপুরুষ আমি। তোমাকে বন্ধু হিসেবে ভাবতে ইচ্ছে হয় খুব। কিন্তু নাহ, ভাবা হয়ে উঠে না। ভয় হয়, এতে বুঝি অসম্মানই হবে তোমার। কারণ যেই দেশের জন্য তুমি প্রাণ দিয়েছ তুমি, সেই স্বাধীন দেশকেই তোমার স্বপ্নের মত গড়তে আমি ব্যর্থ ।
তুমিতো তেমনি আছো, যেমনটি ছিলে স্বাধীনতার আগে টগবগে তাজা তরুণ। তোমার বয়সটি এখনো সেই সময়ের ফ্রেমে এখনো থেমে আছে । আমি কখনো মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, দেখিনি উত্তাল জনসমুদ্র। শুধু শুনেছি স্বাধীনতার কথা, আর দেখেছি আমার মায়ের চোখে সেই দুঃস্বপ্নগুলোর আতঙ্ক।
বড় আদরের সন্তান ছিলে, পড়া-শুনো বিদ্যা-বুদ্ধি সব দিক থেকেই ছিলে ভাল। কার্ল-মার্ক্সের সমাজনীতি আর দান্তের মত কঠিন সব কাব্যের নিয়ে চায়ের কাপে আড্ডার ঝড় তুলতে। তোমার তো নিজের জীবনকে গুছিয়ে নিতে আমেরিকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাবার কথা ছিল তাই না? কিন্তু পারলে কোথায় তুমি? ২৫ শে মার্চের ভয়াবহতা যে তোমার হৃদয়কেও কাঁপিয়ে তুলিছিল।
এরপরেইতো তুমি চাইলে মুক্তি যুদ্ধে যোগ দিতে । তবে আর দশ জন যুবকের মতো বাড়ী থেকে পালিয়ে নয়। মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে বীরের মত যুদ্ধে যেতে। সে মহীয়সী মা-ও তোমার মুখের দিকে চেয়ে সন্তানের দূরে যাবার ব্যথা নীরবে বুকে চেপে তোমায় অনুমতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “যা। দেশের জন্য আমার এক সন্তানকে আমি আজ কোরবানি দিলাম।”
তুমি জানো, পরে তোমার মা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হয়েছিল আমাদের সবার “আম্মা”। আর তোমার আম্মার এই রুদ্রমূর্তিই কাঁপন ধরিয়েছিল সবার বুকে? কিন্তু হায়! যিনি দেশের তরে তোমাকে বলী দিলেন আর সেই দেশই তার উপর দিল রাষ্ট্রদ্রোহীতার কলঙ্ক। লজ্জায় হেঁট হয়ে আসছে মাথা। পারলে ক্ষমা করো।
এদিকে হাজারো তারুণ্যের প্রতীক হয়ে শুরু হলো তোমার যুদ্ধযাত্র । শহুরে ছেলে হওয়াতে তুমি কোনোদিন গ্রামে গঞ্জের খানা-খন্দ ভরা মাঠ, কাদা পিচ্ছিল পথ নদী-নালায় পা রাখোনি। পছন্দের খাদ্য আর পরিষ্কার প্লেট না হলে তোমার কোনদিন খাওয়া হয়নি । সেই তুমি স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েই কেমন যেন পাল্টে গেলে । ক্যাম্পের পোকা মিশ্রিত রুটি আর ঘোড়ার ডাল (সাধারণ সময়ে ঘোড়াকে খাওয়ানোর ডাল) তোমার কাছে তখন অমৃত ।
রণাঙ্গনে মুক্তি বাহিনীর সেক্টর টু এবং কে-ফোস’ এর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশারফ-এর অধীনে তোমার গেরিলা প্রশিক্ষণের শুরু । প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এলে আবার সেই চির পরিচিত ঢাকাতেই, এবার অন্য রূপে, যোদ্ধার বেশে, দেশকে স্বাধীনকরার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ।
ঢাকায় তখন পাকিস্তানি শাসকেরা বিশ্ববাসীকে দেখাতে চাইছে এখানে এখন শান্তির বাতায়ন । কোন বিবাদ নেই, বিদ্রোহ নেই, যারা আন্দোলনের নামে দেশ কে ভাঙবার ষড়যন্ত্র করেছিল তাদের কে সমূলে নির্মূল করে দেয়া হয়েছে । পাকিস্তান এখন এক এবং অখণ্ডিত । তাদের সে ভুল ধারনা ভেঙ্গে দিলে তাদের গালে চড় কসিয়ে । এই ঢাকা শহরে রাত তো বটেই, দিনের বেলাতেই চোরা-গোপ্তা হামলা করে উড়িয়ে দিলে তাদের আত্ম-অহমিকা । বিশ্ববাসী এবং বিদেশী সাংবাদিকদের জানিয়ে দিলে বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধে এখনো শেষ হয় নি, মাত্র শুরু।
ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডে গল্প-গুজবে মাতোয়ারা ৭/৮ জন পুলিশ শুয়ে পড়লো তোমাদের অতর্কিত’ত হামলায়, নিউমার্কেটের সামনে ব্যারিকেড নেয়া অবস্থায় উড়ে গেল পাকিস্তান আর্মির কতিপয় সদস্য । ধানমন্ডি গ্রীন রোডর সামনে ধাওয়া করে আসা একটি জিপ তিনটি স্টেনগান থেকে ছুটে আশা গুলিতে মাতালের মতো টলতে টলতে ধাক্কা খেল ল্যাম্পপোস্টে । তার পর আরও একটি জিপ ও দুটো আমি’ ট্রাককে ফাঁকি দিয়ে অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে নিউ এলিফ্যান্ট রোডে পরে শেষ হল তোমাদের সফল অপারেশন। ততক্ষণে পাকিস্তানী সামরিক জান্তাদের মনে ঢুকে গেছে ভয়। আর ঢাকার আপামর স্বাধীনতা উন্মুখ সাধারণ বাঙ্গালীরা তোমাদের বীরত্বে উল্লাসিত, গর্বিত ।
কিন্তু কী যে হয় গেল হঠাত কে জানে। একাত্তরের ২৯ শে আগস্ট নিজ বড়ীতে পাকিস্তানি আর্মির হাতে বাড়ী ঘেরাও হয়ে ঠিকই ধরা পড়লে তুমি। সাথে গ্রেফতার হলো তোমার ক্র্যাক কমাণ্ডোর দূর্ধর্ষ সহযোদ্ধা, আজাদ, জুয়েল, বাশার, সেকেন্দার, মনোয়ার, বদি, চঞ্চল, রুমী, সামাদ, চুল্লু, আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারক আলভী, শরীফ ইমাম, টগর।
সাথে তোমার বাবা শরীফ সাহেব ও ছোট ভাই জামি। ঘটনার আরও দুদিন পর অত্যাচার আর অপমানের গ্লানি নিয়ে ফিরে এলো তারা । চুল্লুও বেঁচে গেল ঘটনাক্রমে। কিন্তু এলে না তুমি।
তারপর আর খোঁজ মেলেনি তোমার, তুমি চিরতরে হারিয়ে গেয়ে গুটি গুটি পায়ে এগোনো স্বাধীনতার প্রশস্ত রাস্তায় । যে স্বাধীনতা তুমি দেখে যেতে পারনি আজ সে স্বাধীনতা কিন্তু সত্যিই এসেছে। এসেছে তোমাদের মতো অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পায়ে ভর কর রক্ত পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে ।
আজ আমাদের স্বাধীন পতাকা হয়েছে, ভূখণ্ড হয়েছে বিশ্বের দরবারে আমরা স্বাধীন বলে স্বীকৃতি পেয়েছি। এ সব কিছুই হয়তো আজো সম্ভব হতো না যদি তুমি অথবা তোমর মতো বীর সন্তানেরা না থাকতো । আমাদের বিজয় দিবস, এ দিনে আমি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ – এ জাতীয় সংগীত গাইতে যেমন গর্ব অনুভব করি ঠিক তেমনি এই মুহুর্তে বন্ধু তোমায় ভালোবাসি বলতে পেরেও নিজেকে গর্বিত অনুভব করছি । জানি আজ তুমি আলাদা করে কোথাও নেই তবু মিশে আছো বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট- প্রান্তর ও সকল বাঙ্গালীর হৃদয়ে । যেখানে যেভাবেই থেকো না কেন ভাল থেকো বন্ধু, আর মনে রেখো শুধু আমি একা নই, আজ সমগ্র দেশ, দেশের মানুষ তোমায় ভালোবাসে। আমরা তোমায় ও তোমাদের মতো কাউকে ভুলিলি, ভুলবো না কোনোদিন ।
ইতি
তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশের এক গর্বিত নাগরিক।
[ ১৯৫২ সালের ২৯ মার্চ জন্ম হয়েছিল যে বীরের, ১৯৭১ এর ২৯ শে আগস্ট পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পরে এবং পরবর্তীতে তাঁর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি” বইটি পড়ে এদেশে আজ রুমীর হাজারো ভক্ত। আমাদের সকলের পক্ষ থেকে এই বীর যোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা। ]
** ২০১৩ সালে শহীদ রুমিকে খোল চিঠি লিখেছিলাম। হয়ত বাক্য গঠনে ভুল আছে। বানানেও ভুল আছে। তবু সেই চিঠিটা হুবহু আবারো প্রকাশ করলাম।
সূত্রঃ তির্থক আহসান রুবেল এর ফেসবুক পোষ্ট থেকে সংগৃহীত।

দয়া করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
February 2024
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031