বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

অন্যের নিরাপত্তা রক্ষায় দিনরাত প্রহর, অথচ নিজের জীবনেই অনিশ্চয়তার বোঝা আনোয়ারের

মতিন সাগর
  • প্রকাশ সময়ঃ সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

রাজধানীর অভিজাত এলাকায় আপনি নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, নিশ্চিন্তে বসবাস করছেন, অফিস থেকে গভীর রাতে ফিরেও বাড়ির গেটে দাঁড়ানো নিরাপত্তারক্ষীকে দেখে স্বস্তি পান। অথচ যে মানুষটি দিন-রাত জেগে থেকে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তার নিজের জীবনটা ভীষণ অনিরাপদ। দারিদ্র্য, অবহেলা আর অনিশ্চয়তায় ভরা।

এমনই একজন নিরাপত্তারক্ষী আনোয়ার হোসেন। বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। রাজধানীর উত্তরার একটি অভিজাত বাড়ির গেটে বসেই তার দিন-রাত কেটে যায়। চকিতে বসে, গেটের বাইরে চোখ রাখাই তার কাজ। কিন্তু এই কাজের মূল্য? প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা প্রহরায় থেকেও আনোয়ার মাস শেষে পান মাত্র ১২ হাজার টাকা।

এই আয়ে চলতে হয় তার সংসার। স্ত্রী আর দুই সন্তান গ্রামে। তাদের খরচ চালাতে হয় এই সামান্য উপার্জনে। আনোয়ার জানালেন, “যাদের বাসার নিরাপত্তা দিচ্ছি, তারা একবার বাজারে গেলে যা খরচ করেন, আমি পুরো মাসে সেই টাকা আয় করি না। পরিবারে টাকা পাঠানোই কষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় ওষুধের টাকাও জোটাতে পারি না।”

বেতন কম ও আনোয়ারের কাজের পরিবেশও অত্যন্ত কষ্টকর। বিশ্রাম নেই, সাপ্তাহিক ছুটি নেই, বরং প্রতিদিনই ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। “মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্যকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবনটাই ধ্বংস করছি,” কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে আনোয়ারের।

রাজধানীর বাজার পরিস্থিতি তার দুঃখকে আরও ঘনীভূত করেছে। চাল, ডাল, তেল, সবজির দাম ক্রমেই বাড়ছে। আজকাল এক কেজি আলু, পেপে ছাড়া প্রায় সব শাকসবজি কিনতে হয় ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। আনোয়ার প্রশ্ন রাখেন, “এই দামে কিভাবে সংসার চলবে? ১২ হাজার টাকায় এখন কেউ পরিবার চালাতে পারে?”

আনোয়ারসহ হাজারো নিরাপত্তারক্ষীর এই চরম বাস্তবতা ও সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সমাজে নিরাপত্তারক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তাদের পারিশ্রমিক সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা দিন-রাত সজাগ থেকে ধনী-অভিজাতদের নিরাপত্তা দেন, কিন্তু নিজেরাই থাকেন অরক্ষিত।

স্থানীয় সচেতনদের মতে, এই পরিস্থিতি পরিবর্তন না হলে একসময় এটি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে। সমাজে যাদের উপস্থিতি অপরিহার্য, তাদের জীবন যদি দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তায় ভরা থাকে, তবে সেই সমাজে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে আনোয়ারের দাবি- অন্তত ১৫ হাজার টাকা বেতন যেন নির্ধারণ করা হয়। এতে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলবে তার মতো শ্রমজীবী মানুষদের জীবনে।

একজন আনোয়ার হোসেন একটি গল্প নয়, বরং হাজারো নিরাপত্তারক্ষীর প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবনের কষ্ট ও অভাবের কথা সাধারণত আলোচনায় আসে না। অথচ এই শ্রেণির শ্রমিকরা প্রতিদিনের নিরাপত্তা রক্ষায় অনন্য অবদান রাখছেন।

এখন সময় এসেছে এই নীরব যোদ্ধাদের কথা ভাবার। তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, সম্মান এবং মানবিক জীবন নিশ্চিত করলেই সমাজে প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

দয়া করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর